Cinque Terre

আবু নছর মোহাম্মদ সুফিয়ান

০৬ অগাস্ট , ২০২০


ইংরেজি শিক্ষক

সিলেট সরকারি পাইলট উচ্চবিদ্যালয়

প্রশিক্ষক (জীবন দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা)


মানসিক চাপ : মোকাবিলার কৌশল

একবার একটি কাক এসে একটি তাল গাছে বসল। আর সঙ্গে সঙ্গে গাছ থেকে নিচে একটি তাল পড়ে গেল। কাকের তো আর এত ওজন নেই যে তালটি তার ভরের কারণে পড়ে যাবে। তালটি ঠিক ওই সময়ই পড়ত। কিন্তু হঠাৎ কাকটি এসে গাছে বসে পড়ে আর ঠিক তৎক্ষণাৎ তালটি গাছের নিচে পড়ে যায়। দুইটি ঘটনা দৈবক্রমে একই সঙ্গে সংঘটিত হয়েছে। আর সেই থেকে কাকতালীয় শব্দ ব্যবহারের সূচনা। জীবন দক্ষতার অনেকগুলো ঘটনা আপনার-আপনাদের সঙ্গে কাকতালীয়ভাবে মিলে যেতে পারে। তাই লেখার শুরুতেই ‘ডিসক্লেইমার’ কারো সঙ্গে কোনো ঘটনা মিলে গেলে তা একান্তই কাকতালীয়।

করোনাকালে বিভিন্ন কারণে বিশ্বব্যাপী অন্য সময়ের তুলনায় মানুষের মানসিক চাপ বেড়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে প্রধান হলো, জীবনযাত্রার অনিশ্চয়তা এবং সেই অনিশ্চয়তা গ্রহণের অক্ষমতা। কী হচ্ছে, কী হতে যাচ্ছে, কতদিন এ মহামারি থাকবে, আমার চাকরির কী হবে, আমার বাচ্চার পরীক্ষা বা লেখাপড়ার কী হবে বা কীভাবে ব্যবসায় ক্ষতি পোষাবো, ব্যাংকে লোনের কিস্তি কীভাবে পরিশোধ করব ইত্যাদি অনিশ্চয়তা অনেককেই পেয়ে বসেছে। চলমান সময়ে বিশ্বব্যাপী স্বামী-স্ত্রী-সন্তান বা ঘনিষ্ঠজনের মৃত্যু, অসুস্থতা, চাকরিচ্যুতি, ‘ডমোস্টিক ভায়োলেন্স’, বিবাহ বিচ্ছেদ, আয় রোজগার কমে যাওয়া, সংসারে টানাপোড়ন, অখ- অবসর বা কাজ না থাকা, মানুষের সংস্পর্শে যাওয়ার ভীতি ইত্যাদি কারণে মানুষের মনোজগতের ওপর অসহনীয় চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। তাই এই চাপ মোকাবিলায় জীবন দক্ষতার চর্চা অপরিহার্য। অন্যথায় আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের যে অপূরণীয় ক্ষতি হবে তার প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী।

প্রথমত, চাপ কি? চাপ হচ্ছে আপনার কোন প্রয়োজন, চাহিদা, ভয় বা হুমকি ইত্যাদির বিপরীতে শারীরবৃত্তীয় সাড়া। ধরুন আপনি কোনো বিপদের সম্ভাবনা দেখতে পেলেন যে বিপদ সত্যিকার বা কাল্পনিক হতে পারে। তখন আপনার শরীরে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কিছু হরমোন উৎপাদন হবে। আর সেটা হয় আপনাকে বিপদ মোকাবিলা করতে সাহায্য করবে নয়তো বিপদ থেকে পালাতে সাহায্য করবে।

সব চাপ কিন্তু খারাপ নয়। ধরুন আপনি ফুটবল টিমের মেইন স্ট্রাইকার। সবাই আপনার ওপর ভরসা করে আছে। গ্যালারির ওপাশ থেকে মুহূর্মুহু হাততালিÑএগিয়ে যাও, গোল দাও-আমরা আছি তোমার পাশে। এই ইতিবাচক চাপ আপনার মানসিক শক্তি বহুগুণে বাড়িয়ে দিল। আপনি একটার পর একটা গোল দিয়েই যাচ্ছেন।

পরীক্ষা সামনে অথচ পরিবারের সবাই মিলে টিভিতে মজার একটি নাটক দেখছে। আপনিও দেখছেন। হঠাৎ মনে পড়ল আগামীকাল পরীক্ষার কিছু প্রস্তুতি এখনো বাকি আছে। এই চাপ টিভি দেখা থেকে আপনাকে নিয়ে গেল পড়ার টেবিলে। এগুলো হল ইতিবাচক চাপ। তাই ইতিবাচক চাপের ব্যবহার ও নেতিবাচক চাপ পরিহারের জন্য অবশ্যই স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট শিখতে হবে। মানসিক চাপের কারণে অনেকের স্টেজ বা পাবলিক পারফরমেন্স ভালো হয়, আবার অনেকের পারফরমেন্স খারাপ হয়। স্টেজে উঠলে অনেকের স্নায়ুবিক চাপ বেড়ে যায়। স্নায়ুতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে। আবার অনেকের সাবলীলতা ও স্বতঃস্ফূর্ততা বেড়ে যায়।

ধরুন বাজার থেকে আপনি ২০ + ২০ = ৪০ কেজি চাল দুই ঘাড়ে নিয়ে ৫ তলায় আপনার ফ্ল্যাটে উঠলেন। এতে আপনার ঘাড়ের মাংশপেশি ও হাড়ের ওপর যে প্রচণ্ড চাপ অনুভব করবেন সেটা শারীরিক চাপ। মানুষের মনও তো ঠিক একই রকম। তারও একটা ধারণ ক্ষমতা আছে। এর বেশি বোঝা তাকে বইতে দিলে সে ব্যথাতুর হয়ে যাবে। একটি সিএনজি অটোরিকশার ধারণ ক্ষমতা পাঁচজন প্যাসেঞ্জার। তাতে ৮ জন লোক তুললে ওই সিএনজি অটোরিকশা বেশদিন টিকবে না। মনকে বেশি চাপ দিলে সেরকম সে বেশিদিন সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ থাকতে পারে না। তাই মানসিক চাপের একটি সীমা থাকা উচিত। তবে চাপমুক্ত জীবন পৃথিবীতে নেই। পৃথিবীতে ভালো কাজ করলে মৃত্যুর পরে চাপমুক্ত জীবন পেতে পারেন। নতুবা সেখানেও চাপ সহ্য করতে হবে। তবে সেই চাপ হবে অসহনীয়। পৃথিবীর কোনো চাপের সঙ্গে তার তুলনা করা যাবে না।
তাহলে মানসিক চাপ কি খারাপ? না, মানসিক চাপ ততক্ষণ ভালো যতক্ষণ তা সহনীয় মাত্রার মধ্যে থাকে। এর বাইরে চলে গেলে তা আপনাকে বিভিন্নভাবে আক্রমণ করবে। যাদের স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট ক্ষমতা কম এবং নেতিবাচক চাপ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা নেই, তাঁরা প্রাত্যহিক জীবনে মানসিক চাপের জন্য বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারেন। শারীরিক স্বাস্থ্য, মুড, দৃষ্টিভঙ্গি, উৎপাদনশীলতা, সৃজনশীলতা, পারস্পরিক সম্পর্ক এবং জীবন-মানের উপর মানসিক চাপ বিশাল নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে।

মানসিক চাপ আবার দুই ধরণের হতে পারে। অস্থায়ী চাপ এবং ক্রনিক চাপ বা ক্রনিক স্ট্রেস। চাপ ক্রনিক হয়ে গেলে সেটা খুবই মারাত্মক হতে পারে এবং সেটা নিদ্রাহীনতা, বিষন্নতা, হজম সমস্যা, হার্টের সমস্যা, উচ্চ রক্তচাপ, ব্যথা-বেদনা, চিন্তা ও স্মৃতিশক্তির সমস্যার মত নানা স্বাস্থ্যগত সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।

মানসিক চাপ ক্রনিক হয়ে গেলে অনেক সময় সেটা বোঝা যায় না। কারণ আপনি তাতে অভ্যস্ত হয়ে যান। অথচ আপনি বুঝতেই পারবেন নাÑএটা ভিতরে ভিতরে আপনার ক্ষতি করছে। তাই ক্রনিক মানসিক চাপ চিহ্নিত করার কিছু লক্ষণ রয়েছে। আপনি যদি দেখেন আপনার স্মৃতিশক্তি কমে যাচ্ছে, কোনো বিষয়ে মনোযোগ দিতে পারছেন না, বিচার বিশ্লেষণ ক্ষমতা কমে যাচ্ছে, সর্বদা দুশ্চিন্তা লেগে থাকে অথবা উদ্বিগ্ন থাকেন, বিভিন্ন ঘটনার শুধু নেতিবাচক দিক দেখেন, তাহলে বুঝতে হবে আপনার মানসিক চাপ মারাত্মক পর্যায়ে চলে গেছে। মানসিক চাপ আপনার আবেগীয় ক্ষেত্রকে প্রভাবিত করে। আপনার মধ্যে সর্বদা হতাশা বা অসুখি ভাব লেগে থাকে। আপনি অল্পতে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত বা উত্তেজিত হয়ে পড়েন। অথবা আপনি মাঝে মাঝে বা প্রায়ই নিজেকে নিঃসঙ্গ অনুভব করেন। অথচ আপনার চারপাশে আপনার সবই আছে।

চরম মানসিক চাপ মানুষের আচরণকে নানাভাবে প্রভাবিত করে। অতি নিদ্রা বা অল্প নিদ্রা, অতি ভোজন বা অল্প ভোজন, নিজেকে সকলের কাছ থেকেই গুটিয়ে নেওয়া, দায়িত্বে গড়িমসি বা অবহেলা এবং ধূমপান ও মাদকদ্রব্য সেবনের মত আচরণের মাধ্যমেও চরম মানসিক চাপের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। মানসিক চাপ সব সময় বাহ্যিক কারণে হয় না, অভ্যন্তরীণ কারণেও হয়ে থাকে। অনেক মানসিক চাপ আমরা নিজেরাই বেশি বেশি দুশ্চিন্তা করে তৈরি করি। এগুলো ‘সেলফ জেনারেটেড’। জীবন সম্পর্কে অযৌক্তিক টেনশন ও নৈরাশ্যবাদী ধারণা থেকে এগুলোর জন্ম হয়।

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে বিভিন্ন কারণে মানসিক চাপ সৃষ্টি হতে পারে ও বাড়তে পারে। হঠাৎ করে জীবনধারার বড় ধরনের পরিবর্তনের কারণেও এটা হতে পারে। কর্মক্ষেত্রে চাপ কিংবা পারিবারিক অথবা সামাজিক সম্পর্কের জটিলতা, অর্থনৈতিক সমস্যা, অতি ব্যস্ততাহেতু কাজের চাপ, সংসারের চাপ, বাচ্চাদের লেখাপড়া ও ক্যারিয়ার নিয়ে চিন্তা ইত্যাদি মানসিক চাপের অন্যতম কারণ। তাছাড়া নৈরাশ্যবাদীতা, নমনীয়তার অভাব, অবাস্তব প্রত্যাশা, কাজেকর্মে পরিপূর্ণ নিপুণতা প্রদর্শন ইত্যাদি কারণেও মানসিক চাপ সৃষ্টি হতে পারে। মানসিক চাপ কমানোর জন্য ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ঝুলিয়ে রাখুন। আপনি হাসলে দুনিয়া হাসবে। আপনি তো নিশ্চয়ই অন্যের কাছে সদাচরণ প্রত্যাশা করেন। তাই সবার সঙ্গে সদাচারণ প্রদর্শন করুন। আপনি গোমড়ামুখো বা কপাল কুঁচকে থাকলে দেখবেন পৃথিবী আপনার দিকে গোমড়া মুখে তাকিয়ে আছে।

হাসিমুখে থাকার ফজিলত সম্পর্কে একটি বাস্তব ঘটনা বলি। ২০১৮ সালে নিউজিল্যান্ড গিয়েছিলাম আইসিটি প্রশিক্ষণে। প্রশিক্ষণের ফাঁকে এমআইটি’র রিসার্চ ডিরেক্টর দাউদ সাহেব আমাদেরকে তাঁর বাসায় দাওয়াত দিলেন। তাঁর বাসা অকল্যান্ড শহরের মাওরি উপজাতি অঞ্চলে। আমরা প্রশিক্ষণ টিমের একটা অংশ তাঁর দাওয়াত কবুল করলে তিনি গাড়ি দিয়ে আমাদেরকে সারাদিন শহরের দর্শনীয় স্থানসমূহ ঘুরিয়ে বাসায় নিয়ে গেলেন। রাতের খাবারের পর এটা-সেটা গল্প করতে করতে এক পর্যায়ে মাওরিদের প্রসঙ্গ আসল। দাউদ সাহেবের স্ত্রী একজন হাসিখুশি মহিলা। মাওরিদের প্রশংসা করতে করতে এক পর্যায়ে বললেন, ওরা খুবই টেনশন ফ্রি আর ওয়েলকামিং জাতি। রাস্তায় দেখা হলে আপনার দিকে মুখিয়ে থাকবে এক টুকরো হাসি পাওয়ার জন্য। যতক্ষণ তাঁর বা তাঁদের দিকে তাকিয়ে আপনি হাই বা হ্যালো বলবেন না, ততক্ষণ আপনার দিকে তাকিয়ে থাকবে। ছোট-বড় টিলা বা পাহাড়ের ওপর ছোট ছোট বাসায় ওরা বাস করে। ক্যাবলকার দ্বারা বাসায় ওঠানামা করে। অথচ তারা কত সুখি!

কথায় আছে দুঃখ শেয়ার করলে কমে আর সুখ শেয়ার করলে বাড়ে। তাই টেনশনের বিষয়গুলো নিজের মধ্যে জমা না রেখে জীবনসঙ্গী, ভালো বন্ধু, শুভাকাক্সক্ষী বা উপদেষ্টাদের নিকট শেয়ার করুন। তাতে মন হালকা হবে। তবে সতর্ক থাকবেন, আপনার দুর্বলতার সুযোগ যেন কেউ নিতে না পারে। পরীক্ষিতদের সঙ্গে এগুলো শেয়ার করুন। এক্ষেত্রে বর্তমান যুগে নেটওয়ার্কিংয়ের বিকল্প নেই। তাই সকল ধরণের মানুষের সঙ্গে একটা নেটওয়ার্কিং গড়ে তুলতে হবে।

স্ট্রেস থেকে না পালিয়ে স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট শিখুন। একই সঙ্গে তিনটা কাজ সামনে পড়ে গেলে অগ্রাধিকার নির্বাচন করুন। ১, ২, ৩ এভাবে সাজান। কোন কাজটি আগে না করলে আপনি বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারেন তা নির্ধারণ করুন। ধরুন পরিবারে একসঙ্গে তিনটি জিনিস কেনার প্রয়োজনÑএকটি টিভি, একটি ল্যাপটপ ও একটি স্মার্টফোন। অথচ বাজেট আছে একটির। তাহলে কোনটি কিনবেন? এবার নির্বাচন করুন কোনটি কিনলে বাকি দুটির কিছুটা সুবিধা আপাতত পেতে পারেন।

আবেগ নিয়ন্ত্রণের দক্ষতা অর্জন করুন। আবেগ খারাপ নয়। ইতিবাচক আবেগের লালন ও পরিশীলন মানুষের মানসিক স্ব্যাস্থের জন্য উপকারী। ইতিবাচক আবেগগুলো হলো- স্নেহ, মমতা, দয়া, মায়া, ভালোবাসা, সহানুভূতি, সহমর্মিতা ইত্যাদি। নেতিবাচক আবেগ হলো-রাগ, ক্ষোভ, ঘৃণা, হিংসা, বিদ্বেষ ইত্যাদি। তাই মানসিক চাপ কমাতে নেতিবাচক আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য শারীরিক ব্যায়াম ইয়োগা, রিলাক্সেশন, মেডিটেশন ইত্যাদি খুবই সহায়ক। তাই এগুলো চর্চা করতে পারেন। তাছাড়া স্বাস্থ্যকর খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম, বিশ্রাম ও বিনোদন মানসিক চাপ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

করোনাকালীন সময়ে বৈধ আয় রোজগার সীমিত হয়ে গেলে বা রোজগারের পথ বন্ধ হয়ে গেলে ধৈর্য্য হারাবেন না। এখান থেকেই অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা গ্রহণ করুন। মনে রাখবেন There is always a place for you in the other side of the planet. আর ব্যবসায়ী ভাইয়েরা ওয়ারেন বাফেটের কথা মনে রাখুন-‘কখনো সকল ডিম একই ঝুড়িতে রাখবেন না।’