@Framework : Laravel 6 (IT Factory Admin) @Developer : Faysal Younus Daily Sylhet Mirror | যেহীন আহমদ : আমার চেতনার বাতিঘর
Cinque Terre

নজরুল ইসলাম মনজুর

২৮ অক্টোবর , ২০২১


সিনিয়র কোঅর্ডিনেটর এফআইভিডিবি
যেহীন আহমদ : আমার চেতনার বাতিঘর

(যেহীন আহমদ, প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী পরিচালক- এফআইভিডিবি, জন্ম- ১৪ এপ্রিল ১৯৫২, মৃত্যু- ২৮ অক্টোবর ২০১৮)

যেহীন আহমদ একটি প্রিয় নাম। অগাধ ভালবাসার। অপরিসীম আদরের। বিনম্র শ্রদ্ধার। এক মোহনীয় আকর্ষণ আর সরল মুগ্ধতার প্রতীক। দেবতুল্য পূজনীয় এক ব্যক্তিত্বের নাম। তিনি আমাদের সবার প্রিয় ‘যেহীনভাই’।

উনিশ’শ চুরাশি সালে এফআইভিডিবি’র ব্যবহারিক শিক্ষা কর্মসূচিতে কর্মসূচি-সংগঠক নিয়োগে লিখিত পরীক্ষার পরে মৌখিক পরীক্ষায় প্রথম যেহীনভাইয়ের সৌম্য-শান্ত মুখাবয়ব ও ধীর লয়ের কথা বলার ধরন দেখে আমি ম্গ্ধু হই। আমি গ্রুপ থিয়েটার করি শুনে যেহীনভাই খুব খুশি হয়েছিলেন। সত্তর-আশির দশকে আমরা যারা গ্রুপ থিয়েটার করতাম, তাদেরকে পরিবারে এবং সমাজে বখে যাওয়া হিসেবেই ভাবা হতো। যেহীনভাইয়ের থিয়েটারের প্রতি এই ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি আমাকে তখন দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। উনি বলেছিলেন, “নাটক হতে পারে গ্রামের পশ্চাৎপদ মানুষকে কুসংস্কারমুক্ত করতে আর তাদের সচেতনতা বাড়াতে একটা গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।”

পরবর্তীতে যেহীনভাইয়ের পরামর্শে একটি কেন্দ্রীয় গণ-সংস্কৃতি সেল গঠন করা হয়েছিল। এই সেলের মাধ্যমে গণ-সংস্কৃতি কার্যক্রম উন্নয়ন ও পরিচালনা করা হতো। গণনাটক দল গঠন করা এবং তাদের গণনাটক ও গণগান নির্মাণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হতো। স্ক্রিপ্ট ছাড়া মুখে মুখে স্থানীয় কোনো ইস্যু বা ঘটনাকে সাজিয়ে স্থানীয় ভাষায় তা উপস্থাপন করা হতো। একেবারে তাদের নিজস্ব ব্যবহারিক উপকরণ আর কস্টিউমের ব্যবহার ছিল খুবই লাগসই। মেকাপ ছাড়া পাটের আঁশ দিয়ে পাকা সাদা মুখের দাড়ি, কচুরিপানার শিকড় দিয়ে কালো মুখের দাড়ি তৈরি করা হতো। নিরক্ষরতা, কুসংস্কার ও এলাকার বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে গণনাটক ও গণগান উপস্থাপন করা হতো। যেহীনভাইয়ের প্রত্যক্ষ পরামর্শ ও সহায়তায় এফআইভিডিবি’র সকল কর্মএলাকায় শিক্ষা-সচেতনতায় গণনাটকের প্রয়োগ ছিল খুবই সফল।

সিলেট শহরের তৎকালীন সিলেট অডিটোরিয়ামে (বর্তমানে কবি নজরুল অডিটোরিয়াম) এফআইভিডিবি’র এক বড় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রয়াত পটুয়া শিল্পী কামরুল হাসান। ঐ অনুষ্ঠান শেষে ছিল গণনাটক উপস্থাপনা। গ্রামের ঐ গণনাটক দলের জন্য তা ছিল জীবনে প্রথমবার মঞ্চে ওঠা। তাদের নিজেদের ব্যবহৃত কাস্তে, মাতলা, গামছা, লুঙ্গি বা পিরানই ছিল ঐ দিনের গণনাটকের অনুষঙ্গ। পটুয়া শিল্পী কামরুল হাসান গ্রামের এই গণনাটক দলের উপস্থাপনা দেখে যারপরনাই খুশি হয়েছিলেন। তিনি অবাক হয়ে মন্তব্য করেছিলেন, “ঢাকার মহিলা সমিতি মঞ্চে উপস্থাপিত নাটকের থেকেও আমি বেশি উপভোগ করেছি এবং মুগ্ধ হয়েছি। গ্রামের মানুষের সার্বিক উন্নয়নে গণনাটকের প্রয়োগ ও তাদের মাধ্যমেই তা উপস্থাপন করার পরিকল্পনা বা কৌশল দেখে আমি অভিভূত।”

যেহীনভাই ছিলেন এক পরশপাথর। যা ছুঁয়েছেন তা-ই হয়েছে খাঁটি। যেহীনভাইয়ের সান্নিধ্যে যে এসেছে সে-ই মজে গেছে তাঁর দুর্নিবার মোহনীয় আকর্ষণে। সকল স্তরের কর্মীদের প্রতি তাঁর ছিল সমান দৃষ্টিভঙ্গি। আমার একটি অভিজ্ঞতা বলি। আমি তখন নতুন জয়েন করেছি। কেন্দ্রীয় অফিসে কাজে এসেছি। একটি মাঠ-অফিসের নাইটগার্ড কুটুভাই যেহীনভাইয়ের রুমের দরজায় আসতেই তিনি দাঁড়িয়ে হাসিমুখে তাঁকে রুমে অভ্যর্থনা জানালেন। যে-কোনো স্তরের কর্মীরই তাঁর কাছে ছিল সহজ প্রবেশাধিকার। সংস্থার নির্বাহী হয়েও এমন বিনয়ী আচরণ আমার তরুণ মনকে তখন অবাক বিস্ময়ে হতবাক করে দিয়েছিল।

যেহীনভাই গান শুনতে খুব ভালবাসতেন। আধুনিক ক্লাসিক গান অথবা পুরাতন রাগভিত্তিক উচ্চাঙ্গসংগীত, খেয়াল সহ নানান ঘরানার গান শুনতে তিনি ভালবাসতেন। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের পাশাপাশি অতুলপ্রসাদের গান তিনি শুনতেন। গজলও তাঁর পছন্দের বিশেষ তালিকায় ছিল। শুধু নিজে শোনা নয়, প্রিয় গানটি কাউকে শুনিয়েও তিনি আনন্দিত হতেন।

বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে সেতার ছিল তাঁর খুব প্রিয়। হোম থিয়েটারে শোনা ছাড়াও সেতারের ওস্তাদ আনিয়ে সেতারবাদন আসরের আয়োজন করতেন। এফআইভিডিবির যে-কোনো অনুষ্ঠান শেষে বা দেশি-বিদেশি অতিথিদের জন্য সংগীতসন্ধ্যার আয়োজন করা হতো। সেখানে অবশ্যই রাগভিত্তিক উচ্চাঙ্গ সেতারবাদন, মনিপুরী নৃত্য, সিলেটের আঞ্চলিক নৃত্য ধামাইল ইত্যাদি থাকতো।

সংগীত বা রাগ সম্পর্কে তালিম তিনি কোথায় পেয়েছিলেন আমার জানা নেই। ইমন, বিলাবল, ভৈরবী, খাম্বাজ, মেঘমল্লার সহ অনেক রাগ সম্পর্কে যে শুধু বলতেই পারতেন তা না, গেয়েও শোনাতে পারতেন। তাল-লয়-মাত্রা সম্পর্কেও তাঁর ছিল স্পষ্ট ধারণা। কোন গান কোন রাগের বা কোন রাগাশ্রয়ী তাও খুব ভাল করে বলতে পারতেন।

যেহীনভাইকে আমি যেভাবে দেখেছি তা সংক্ষেপে বলি। যে-কোনো অবস্থায় তিনি নিয়মিত বই পড়তেন। বাংলা ও ইংরেজি সাহিত্যের পাশাপাশি বিশেষত শিক্ষা-গবেষণা বিষয়ক বই পড়তেন। প্রিয় বা প্রয়োজনীয় ইংরেজি বিষয়গুলো বাংলায় অনুবাদ করতেন। অনুবাদকাজটি যেহীনভাই খুব উপভোগ করতেন বলে আমার ধারণা। আর না-হলে সবসময় তিনি পৃথিবীর সেরা সেরা শিক্ষাদার্শনিক ও গবেষকদের লেখা পড়তেন এবং তা বাংলায় অনুবাদ করতেন। বিশেষ করে পাওলো ফ্রেইরিকে অনুবাদ করা ছিল তাঁর একটি বড় কাজ। 

পাওলো ফ্রেইরি ছাড়াও তিনি বেঞ্জামিন ব্লুম, ব্রুনার, জ্যঁ পিয়াজে, লেভ ভিগৎস্কির মতো অনেক শিক্ষাদার্শনিকের লেখাও অনুবাদ করেছেন। বিশ্বসাহিত্যের সাথে নব্য ও স্বল্প সাক্ষর পড়ুয়াদের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার ইচ্ছার কথা সবসময় তিনি আমাদেরকে বলতেন। আমরা ‘বিদেশের সেরা গল্প’ নামে দু’টি পুস্তিকা প্রকাশ করেছিলাম। 

দীর্ঘদিন তিনি পনেরো-বিশ কেজি ওজনের একটি ব্যাগ কাঁধে বহন করতেন। তাতে বেশিরভাগ থাকতো ওজনদার দেশি-বিদেশি বই। তাঁর ঢাকা-অফিস, সিলেট-অফিস ও নিজ বাসায় সংগ্রহে আছে অনেক অনেক বই। যা ছিল তাঁর নিত্যদিনের অবসরের সঙ্গী।

শুধু তিনি নিজেই বই পড়তেন তা না, অন্যদেরও বই পড়তে উৎসাহিত করতেন। যার যেমন আগ্রহ তাকে তেমনই বই পড়ার জন্য দিতেন।

এফআইভিডিবির একটি সমৃদ্ধ লাইব্রেরি আছে। লাইব্রেরিকক্ষের ফ্লোর থেকে ছাদ পর্যন্ত বইয়ের তাকের পূর্ণাঙ্গ ডিজাইন নির্দেশনা ছিল যেহীনভাইয়ের। এমনকি ব্যবহারিক শিক্ষা কর্মসূচির গ্রামীণ পাঠাগার স্থাপন ও ‘পাঠাগারে প্রচুর পরিমাণে বই থাকতে হবে’ তাঁর এই নির্দেশনা সবসময় আমাদের প্রতি ছিল।  

যেহীনভাই নিয়মিত শিক্ষা-গবেষণা বিষয়ক প্রবন্ধ লিখতেন। এফআইভিডিবির কর্মীদের জন্য সেমিনার আয়োজন করে তা উপস্থাপন করতেন। উপস্থাপনা শেষে আলোচনাচক্র পরিচালনা করতেন। এফআইভিডিবির সকল কর্মীদের জন্য তা থাকতো উন্মুক্ত। আমি সেই চুরাশি সালে ব্যবহারিক শিক্ষা কার্যক্রমে যোগদানের পর যেহীনভাইয়ের কাছেই প্রথম শুনলাম পাওলো ফ্রেইরির নাম। তাঁর শিক্ষা-দর্শন আমাদের কাছে উপস্থাপন করতেন খুব সহজভাবে। এফআইভিডিবির লক্ষ্য জনগোষ্ঠীর মানবিক উন্নয়ন কীভাবে ঘটানো যায়, তাঁর একটা সুন্দর চিত্র তুলে ধরতেন আমাদের সামনে। আমরা যেহীনভাইয়ের কাছেই প্রথম শুনলাম Conscientization  শব্দটি। এই শব্দের বিভিন্ন ভাবানুবাদ করে দেখালেন। এর মধ্যে ‘প্রচেতনীকরণ’, ‘বিশ্লেষণী সচেতনতা’ বা ‘চেতনউদ্দীপন’ শব্দগুলো ছিল। তবে পরবর্তীতে আমরা ‘প্রচেতনীকরণ’ শব্দটির ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ করেছি। এ-সম্পর্কে যেহীনভাইয়ের একটা বিশ্লেষণ উল্লেখ না করে পারছি না : “জগৎ সম্পর্কে এবং জগতের মধ্যকার বিভিন্ন সামাজিক-রাজনৈতিক দ্ব›দ্ব ও বৈপরীত্য সম্পর্কে সম্যক উপলব্ধি করাই প্রচেতনীকরণ প্রক্রিয়ার অভিষ্ট।”

আমরা তাঁর কাছ থেকে জেনেছি যে সমাজের পিছিয়ে-পড়া জনগোষ্ঠী কীভাবে নীরব বা স্তব্ধতার সংস্কৃতিতে বসবাস করে। তাঁরা একটা যাদুময় বা ঐন্দ্রজালিক চেতনস্তরে থাকে। সকল অবস্থা বা পরিস্থিতিকে তাঁরা কপালের লিখন বলে মেনে নেয়। ঘটনার রহস্য বা কারণ অনুসন্ধান করতে যায় না। তাই ঐ জনগোষ্ঠীকে প্রচেতনীকরণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে একটা বিশ্লেষণী চেতনস্তরে নিয়ে যাওয়া দরকার। এই বিষয়গুলোকে আমরা একজন উন্নয়নকর্মী হিসেবে ধারণ করেছি, লালন করেছি এবং তা আমাদের কাজে প্রতিফলন ঘটানোর চেষ্টা করেছি। ব্যবহারিক শিক্ষা বা বয়স্ক সাক্ষরতা কর্মসূচি পরিল্পনা ও বাস্তবায়নে, ব্যবহারিক সাক্ষরতা শিক্ষাক্রম উন্নয়নে এবং ব্যবহারিক সাক্ষরতা প্রশিক্ষণ মডিউল উন্নয়নে আমরা তাঁর চিন্তাভাবনা অনুসরণ করেছি। এফআইভিডিবির প্রতিটি শিখন-শিক্ষণ উপকরণ ও প্রকরণ প্রণয়নে ব্রাজিলিয় শিক্ষাবিদ পাওলো ফ্রেইরির ‘মনো-সামাজিক’ (Psycho-Social) এবং ‘সমস্যা সমাধান প্রক্রিয়া’ (Problem Posing Approach) ধারণার দ্বারা বহুভাবে প্রভাবিত হয়েছে।

যেহীনভাইয়ের দিকনির্দেশনা ছিল এ-রকম : “সাক্ষরতা, অব্যাহত ও জীবনভর শিক্ষা-ব্যবস্থার আয়োজনের নবতর চ্যালেঞ্জ হলো বিভিন্ন প্রেক্ষাপটের বহুমাত্রিক চাহিদা নিরুপণ করে কর্মসূচিকে শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক ও শিক্ষার্থীবান্ধব রূপ দেওয়া। অসাক্ষর, প্রাক-সাক্ষর, প্রান্তিক-সাক্ষরদের জন্য বিভিন্ন ধরনের সাক্ষরতা কার্যক্রম প্রয়োজন। তেমনি, সাক্ষরদের মধ্যেও ভিন্ন ভিন্ন চাহিদা বিদ্যমান। কেউ-বা বিভিন্ন ধরনের পেশাভিত্তিক প্রশিক্ষণ নিতে আগ্রহী, কেউ-বা আরো অগ্রসর সাক্ষরতা-দক্ষতায় আগ্রহী, কারও-বা প্রয়োজন সমগোত্রীয় আন্তঃযোগাযোগ ও সম্পর্কস্থাপন। উন্নয়ন সংস্থা ও কর্মসূচিকে সমস্যার বহুমাত্রিকতা ও বহুমুখিতায় ইতিবাচকভাবে সাড়া দিতে সক্ষম হতে হবে। মৌলিক সাক্ষরতা, অব্যাহত ও জীবনভর শিক্ষার প্রসার, আয়োজন ও মানোন্নয়নে দরকার একটি সম্মিলিত প্রয়াস। সরকার, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা, সুশীল সমাজ, জনগণ সকল স্তরের অংশীজনের ইচ্ছা, আগ্রহ, পরিকল্পনা প্রণয়ন, বাস্তবায়ন এবং পরিবীক্ষণে কার্যকর সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন। এই সার্বিক অংশগ্রহণই আমাদের কাক্সিক্ষত শিখন সমাজ (learning society) নির্মাণের পথের অগ্রযাত্রাকে বেগবান করবে।”

এ-দেশের নিরক্ষর, নিপীড়িত মানুষের জন্য তাঁর যে হৃদয়নিংড়ানো ভালবাসা তা আমাকে মুগ্ধ করেছিল। তাঁর প্রতিটি কাজেই প্রতিফলন থাকতো কীভাবে এ-দেশের শিশু, নারী সহ নিরক্ষর জনগোষ্ঠীকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করা যায়। 

যেহীনভাই ছিলেন আমাদের চেতনার বাতিঘর। এই আলোয় আমরা চলেছি পথ। আমরা যেন দিক না হারাই। তাঁর দেখানো পথে যেন চলতে পারি বাকি পথ। তিনি যে-মুগ্ধতা ছড়িয়েছেন আমাদের মনে সেই মুগ্ধতায় থাকতে চাই সারাজীবন।