@Framework : Laravel 6 (IT Factory Admin) @Developer : Faysal Younus Daily Sylhet Mirror | নগরীতে আগুন: দেবালয় রক্ষা করবে কে?
Cinque Terre

বেদানন্দ ভট্টাচার্য

০৪ ফেব্রুয়ারী , ২০২২


বীর মুক্তিযোদ্ধা, রাজনীতিবিদ ও আইনজীবী
নগরীতে আগুন: দেবালয় রক্ষা করবে কে?

নগরীতে আগুন লাগলে দেবালয় রক্ষা করা যায় না। দুনিয়াজোড়া নয়া উদারনীতিবাদের রমরমা এ সময়ে সম্পদ আহরণের উদগ্র প্রতিযোগিতা সমাজের স্বাভাবিক প্রবণতা।  উপরের স্তরে সম্পদ সঞ্চিত হলে তা চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়বে এবং হাড়-হাভাতেরা তাই চেটেপুটে খেয়ে বেঁচেবর্তে থাকবেসমাজের দর্শন যখন এ জায়গায় দাঁড়ায়, তখন যেনতেন প্রকারে সম্পদ সঞ্চয় করার ‘অধিকার’ স্বীকার করে নেওয়া ছাড়া উপায় তো থাকে না, ব্যক্তি স্বাতন্ত্রের নামে ব্যক্তি স্বার্থপরায়ণতা এ অবস্থায় একধরণের সামাজিক ও নৈতিক সমর্থন ভোগ করে। 

আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজ যে আর্থসামাজিক দর্শন ধারণ করে তার পোশাকি নাম বাজার অর্থনীতি। বাজার মানে নিজের দিকে বোঁচকা টানা। মানবিক মূল্যবোধ, সহমর্মিতা, সামাজিক দায়িত্ববোধ, পারস্পরিক ভালোবাসা ইত্যকার বিষয় যারা চর্চা করেন তারা এ সমাজে বেখাপ্পা, বেমানান ও বোকা হিসেবে চিহ্নিত হওয়াই স্বাভাবিক। 

রাষ্ট্রের অনুসৃত অর্থনৈতিক নীতি আর্দশের অনুষঙ্গ হিসাবে সমগ্র সমাজে লুটপাট ও নীতিহীনতার যে নরক গুলজার অবস্থা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তার থেকে মুক্ত থাকবে এমন চিন্তা যারা করেন তাদের সরল সদ্ভাবনার বাস্তব কোনো উপযোগিতা আছে বলে মনে করার কোনো সুযোগ নেই। বাংলাদেশের অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ আছে। শিক্ষকমণ্ডলী ভিন্ন ভিন্ন রঙে রঞ্জিত। তাদের এ রংবাজি নিতান্তই ভাবাদর্শগতএমনটা মনে করার জোরালো প্রমাণ নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিজ নিজ ভাবাদর্শগত অবস্থান, চিন্তা, প্রতিজ্ঞা, ভাষা ও ভাবনার বিভিন্নতা থাকা স্বাভাবিক ও সঙ্গতও বটে। কারণ সমাজের সর্বোচ্চ মর্যাদার বুদ্ধিজীবী সমাজ পুঁথিগত বিদ্যাকেন্দ্রিক হয়ে পড়লে তা সমাজকে বন্ধ্যাত্বের দিকে নিয়ে যাবে। বিশ্ববিদ্যালয় সমূহে নানা পথ ও মতের অবাধ চর্চা হবে এবং সকল ধরনের জ্ঞানচর্চার মুক্ত অঙ্গন হিসেবে এগুলো গড়ে উঠবে এটাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণাগত ভিত্তি। তা না হলে একটি বিশ্ববিদ্যালয় বড়জোর একটি বড় কলেজ বা স্কুলে পরিণত হবে। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বৃহত্তর সিলেটের সকল মানুষের পঞ্চাশ বছরেরও অধিক সময়ের লড়াই সংগ্রামের ফসল। এ কারণে একে ঘিরে সিলেটবাসীর প্রত্যাশা অনেক বেশি। কখনও কখনও ভাবাবেগের আতিশয্য ও তার অনিয়ন্ত্রিত প্রকাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বকীয়তাকে বিঘ্নিত করার উপক্রম ঘটায়এই সত্যটি স্বীকার না করলে সিলেটের মানুষের  মধ্যে বিরাজমান অঞ্চল-মনস্কতার সীমাবদ্ধতা অনুধাবনে ব্যর্থতার অভিযোগে অভিযুক্ত হতে হবে।  

সম্প্রতি একটি হলের অব্যবস্থাপনা ও অনিয়ম সংক্রাস্ত ছাত্রীদের ক্ষোভ প্রশমনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের লজ্জাজনক ব্যর্থতা এবং শিক্ষকমণ্ডলী ও প্রশাসনের সংবেদনশীলতার অভাব পরিস্থিতিকে একটা উদ্বেগজনক মানবিক সংকটে রূপান্তরিত করে। রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্ত উপাচার্য মহোদয় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তাঁর অদক্ষতা, ব্যর্থতা, সন্তানসম ছাত্র-ছাত্রীদের আবেগ অনুভূতির প্রতি উদাসীনতা এবং নিষ্ঠুর মানসিকতার যে অভিপ্রকাশ ঘটিয়েছেন তা শুধু নিন্দনীয়ই নয় বরং তাঁর এ পদে থাকা সরকার ও সরকারি দলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিবেচিত হওয়ার ক্ষেত্র সৃষ্টি করেছে। এ ধরণের দুর্বলচিত্ত ও অদক্ষ ব্যক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মত নাজুক জায়গায় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করলে সরকার ও সরকারিদলের জন্য শুভপ্রদ হবে না। দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হচ্ছে সরকারের রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখার আনাড়িপণা প্রদর্শন করে পরিস্থিতিকে জটিলতর করে তোলেন। গুজবে প্রকাশ,  বিশ্ববিদ্যালয়ে ১২০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের বিষয় আছে এবং ঐ প্রকল্প সংক্রান্ত স্বার্থবানদের স্বার্থরক্ষার প্রবণতা সরকারের দায়িত্বশীল মহলকে বিভ্রান্ত করেছে। শিক্ষকমণ্ডলীর অভ্যন্তরীণ দ্ব›দ্ব এবং বৈষয়িক স্বার্থ প্রণোদিত রেষারেষি যথাযথ বিবেচনাবোধকে আচ্ছন্ন করেছে বলে অনেকেই মনে করেন। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক প্রফেসর ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল দম্পতি দৃশ্যপটে আবির্ভূত হয়ে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছেন। এজন্য তারা সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। অনশনরত ছাত্র ছাত্রীদের জীবন রক্ষায় তাঁদের তৎপরতা এবং ভাবমূর্তি মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে সন্দেহ নেই। তাঁরা সরকারি অ্যাসাইনমেন্ট বাস্তবায়নে ‘সরকারি সফরে’ এসেছিলেন। এক দল পুলিশ সঙ্গে নিয়ে (যদিও গত কয়েক বছর ধরে তিনি পুলিশি নিরাপত্তা পেয়ে আসছেন) তাঁদের ক্যাম্পাস দাপিয়ে বেড়ানোর দৃশ্য সরকারি মহলে তাঁদের উচ্চ অবস্থান নির্দেশ করে। সরকার বিশেষ পরিস্থিতিতে দক্ষ উপযুক্ত ব্যক্তির সহযোগিতা নেবেনএটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া এবং সরকারের স্থিতপ্রজ্ঞ বিবেচনা বলে বিবেচিত হওয়ার যোগ্য। বিষয়টি আরও প্রশংসনীয়  হতো যদি আন্দোলনরত ছাত্র-ছাত্রীদের এবং তাদের সহায়তাকারী সাবেক ছাত্রদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলাসমূহ প্রত্যাহার করে এসে অনশন ভাঙানো হতো অথবা অনশন ভাঙার পরে পরেই সরকার এই কাজটি করতেন। এখন পর্যন্ত তেমন কোনো উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়নি। বর্তমান মেয়াদকালে সরকারের রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে আত্মবিশ্বাস দুর্বল। ফলে সরকার ক্রমাগতভাবে অধিকমাত্রায় আমলাতন্ত্রের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। বুদ্ধিবৃত্তিক আড়ষ্টতা ও হৃদয়হীনতা আমাদের আমলাতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যা মোকাবেলা করার ক্ষেত্রে সরকার যে আড়ষ্ট বুদ্ধির পরিচয় দিয়েছেন তা আমাদের আমলাতন্ত্রের নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে কি না বলা মুশকিল। ড. জাফর ইকবাল দম্পতি অনশনরত ছাত্রদের আবেগকে স্পর্শ করে অনেক কথাই বলেছেন যা সঙ্কট বিমোচনে সহায়ক হয়েছে। তিনি সরকারের কাছ থেকে প্রাপ্ত তাঁর লেখক সম্মানির দশ হাজার টাকা আন্দোলতরত ছাত্রদের চাঁদা দিয়ে বলেছেন ‘সাহস থাকলে আমাকে গ্রেপ্তার করুন’। সরকার ‘সাহস’ করেনি। তবে পুলিশের বড়কর্তা সাংবাদিকদের বলেছেন এগুলো তদন্তের ব্যাপার। যার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাবে সেভাবেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তার এ উক্তি সরকারের ‘সাহস’ এর সঙ্গে সংগতিপূর্ণ কী না ঠিক বুঝা গেল না। তবে এভাবে একজন ব্যক্তি পরিস্থিতির নাজুকতার সুযোগে রাষ্ট্রশক্তিকে চ্যালেঞ্জ করলে রাষ্ট্রের কিছু কর্তব্য উপজাত হয়। রাষ্ট্র যদি এ কর্তব্য পালনে ব্যর্থ হয় এটাকে তার সফলতা মনে করা সংগত নয়। সরকারি দল ও প্রশাসন যন্ত্রের অবিমৃষ্যকারীতার জন্য রাষ্ট্রকে বিষয়টি হজম করতে হয়। এর দায় দায়িত্ব নির্ধারণে সরকারকে নিজ প্রয়োজনেই উদ্যোগী হওয়া আবশ্যক।

 শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনের ফলাফল কী হবে তা দেখার জন্য আমাদের আরও অপেক্ষা করতে হবে। তবে ইতোমধ্যে যে বিষয়টি প্রকাশিত হয়েছে তা হচ্ছে প্রথমত রাষ্ট্র, সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের আচরণ তরুণ সমাজের কাছে এই বার্তাটি পৌঁছে দিয়েছে যে এই রাষ্ট্র, এই সমাজ তার আবেগকে মূল্যায়ন করতে আগ্রহী নয়। তার জীবন ক্ষমতাধরদের বৈষয়িক ও পদ-পদবির গুরুত্বের চেয়ে অধিক মূল্যবান নয়। এতে তরুণ সমাজ হতাশা ও বিচ্ছিন্নতার দিকে এগিয়ে যেতে প্ররোচিত হবে। সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তরুণদের মধ্যে ইতিবাচক ধারণা সঞ্চরণের কার্যকর উদ্যোগ নেবেন বলে বিশ্বাস করতে চাই। দ্বিতীয়ত ছাত্র-শিক্ষকের স্বাভাবিক সম্পর্ক, পারস্পরিক স্নেহ-শ্রদ্ধা-ভালাবোসার বন্ধন রীতিমত শিথিল হয়ে পড়েছে। একে পুনরুদ্ধার করার জন্য শিক্ষক নিয়োগে রাজনৈতিক বিবেচনা, শিক্ষক সমাজের মধ্যে ক্ষমতাভিত্তিক বিভাজন ইত্যাদি কারণসমূহ মোকাবিলা করার জন্য আন্তরিক হতে হবে। ছাত্র সংসদ সমূহের নির্বাচন না হওয়ার ফলে ছাত্রদের মধ্যে নেতৃত্বের সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। অরাজনৈতিক স্বতস্ফূর্ত সংঘশক্তি বিপজ্জনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করার উপযুক্ত ক্ষেত্র প্রস্তুত করে। অবিলম্বে সকল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান করে ছাত্রদের আস্থাভাজন নেতৃত্ব বিকাশিত করতে হবে। 

একজন প্রায় অশিক্ষিত জনৈক পর্যায়ের মেঠোকর্মী হিসেবে আমার এ লেখা খুব গুরুত্ব পাবেএমন প্রত্যাশা আমি করছি না। তবে রাষ্ট্রের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ছাড়া নানাস্থানে নানাভাবে এ ধরণের বিষ্ফোরণের আশংকা থেকেই যাবে। বিরাজনীতিকরণের প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকলে নৈরাজ্য, বিচ্ছিন্নতা ও আত্মবিনাশী অভিযাত্রাই আমাদের নিয়তি হয়ে যাবেএমন আশঙ্কা যারা করেন তাদের সাথে দ্বিমত করা খুব সহজ নয়।