Cinque Terre

প্রণতি চক্রবর্তী

২৩ ডিসেম্বর , ২০২২


গদ্যলেখক ও প্রাবন্ধিক
মুক্তিযোদ্ধা রবি চৌধুরী : যুদ্ধে যাবার শ্রেষ্ঠ সময় ছিল তাঁর

মুক্তির আকাক্সক্ষায় উজ্জীবিত বাঙ্গালি তখন জেগে উঠেছিল। জনসমুদ্রে জেগেছিল ঊর্মিমালা। ’৬৯-এর টালমাটাল দিনগুলোতে বিয়ানীবাজারের নিভৃত পল্লী নিদনপুরের নিস্তরঙ্গ জীবনেও ঘটেছিল চেতনার সঞ্চারণ। তখন আমার পুতুল খেলার বয়স। আশ্চর্য-বিস্ময়ে দেখেছি প্রতিদিনের চেনা আটপৌরে মানুষগুলো ক্রমেই মিছিলে মিটিং-এ সরব হয়ে উঠেছিল। আইয়ুব খানের পতন কিংবা ’৭০-এর সাধারণ নির্বাচন এবং তার মধ্য দিয়ে ঘটে যাওয়া পরিবর্তনগুলো বুঝার ক্ষমতা আমার ছিল না। 

মনে আছে নির্বাচনের পরপরই কি সব তুলকালাম কাণ্ড ঘটে যাচ্ছিল। বয়স্করা শলাপরামর্শ করছেন শঙ্কায় এবং প্রত্যয়ে। এই বৈপরীত্য আমাকে হয়তোবা স্পর্শ করেছে কিন্তু তার গূঢ় রহস্য অনুধাবন আমার সাধ্যের মধ্যে ছিল না। একদিন দেখা গেল আমাদের বাড়ির উত্তরের টিলায় গ্রামের ৩০/৩৫ জন যুবক শারীরিক কসরত তালিম নিচ্ছে। টেকো মাথার এক ভদ্রলোক ঘুরে দাঁড়াও, সামনে চল ইত্যাদি নানা রকম দুর্বোধ্য শব্দাবলী উচ্চারণ করে প্রশিক্ষণের দায়িত্ব পালন করছেন। দুর্ভাগ্যের বিষয় তার নাম আজও কারো কাছ থেকে সংগ্রহ করতে পারিনি। প্রশিক্ষণার্থী এই দলটির মধ্যে আমার মেঝভাই রবি চক্রবর্তীও ছিলেন। হালকা পাতলা গড়ন, শ্যামলা রং, টানাটানা বড় চোখ, মুক্তোর মতো দাঁত, বুদ্ধিদীপ্ত এবং ভীষণ সাহসী ছিল আমার সেই ভাইটি। মা বলতেন তাকে বড় কষ্ট করে বাঁচিয়ে রাখতে হয়েছিল। জন্মের ৩ দিন পর তাঁর শরীরে কী নাকি হয়েছিল। শরীরের সমস্ত চামড়া উঠে যায়। কচি কলাপাতা দিয়ে জড়িয়ে তাকে কোলে নিতে হতো, শোয়াতে হতো। সেই ছেলেটি ৭০-এ সতের বৎসরের টগবগে যুবক। যুদ্ধে যাওয়ার শ্রেষ্ঠ সময় ছিল তাঁর। 

তখন মার্চ কি এপ্রিল মাস। একদিন ভোরে আমাদের ঘুম থেকে ডেকে উঠানো হলো। উঠে দেখলাম উঠোন ভর্তি অনেক লোক। বাবা বললেন এখনই বেরিয়ে যেতে হবে। আর সময় নেই। এক কাপড়ে ভীত-সন্ত্রস্ত এবং নিঃস্ব গোটা পরিবার পাড়ি জমালাম অজানার উদ্দেশ্যে। লাতু সীমান্ত দিয়ে পৌঁছা গেল ভারতের মহিশাসন নামক স্থানে। তারপর ঠাঁই হলো আনিপুর শরণার্থী ক্যাম্পে। সেই থেকে গোলাভরা ধান আর পৈতৃক বিশাল বাড়ি চিরদিনের জন্য অতীতের বিষয় হয়ে গেল। স্বাধীনতার পর জানতে পারলাম আমার প্রপিতামহের কিংবা তারও পূর্ববর্তী কোন পূর্ব পুরুষের স্থাপিত বসতভিটা এখন অন্য কারো। কিন্তু কিভাবে? সে প্রশ্নের উত্তর খোঁজার মতো কোনো লোক সেদিনও আমরা খুঁজে পাইনি। আজও পাই না। আমাদের ঠাঁই হলো সুপাতলার সার্বজনীন কালী বাড়িতে-আশ্রিত হিসেবে। 

আনিপুর ক্যাম্পে থাকা অবস্থায় কখনও কখনও যুদ্ধে যাওয়ার ইচ্ছার কথা আমার ভাই রবি চক্রবর্তী প্রকাশ করেছে। মা অসুস্থ, বাবা নিঃস্ব, রিক্ত, বিধ্বস্ত। তারা সায় দেননি। একদিন সে উধাও হয়ে যায়। কোথায় কীভাবে ট্রেনিং নিল আমরা জানতে পারিনি। তবে জানা গেল সে যুদ্ধে গেছে। সেই থেকে মা শয্যা নিলেন। প্রায় ছয় মাস তিনি করিমগঞ্জ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। ডিসেম্বর মাসে মা ক্যাম্পে ফেরেন। শুরু হয় তার ব্যাকুল প্রতীক্ষার পালা। যুদ্ধ প্রায় শেষ। ছেলে ফিরে আসবে। যে কোনো দিন, যে কোন সময়-আশায় বুক বাঁধেন মা। না। ছেলে তার ফিরে আসেনি। প্রতীক্ষার দীর্ঘ প্রহর গুণতে আমরা ফিরে আসি স্বাধীন মাতৃভ‚মিতে। তবে এখন আর সম্পন্ন গৃহস্থ পরিবার হিসেবে নয়-বাস্তুহীন, সম্পদহীন, নিঃস্ব হয়ে। আগেই বলেছি আশ্রয় মেলে দেবালয়ে। 

এদিকে যুদ্ধের ময়দানে নানা জায়গা ঘুরে রবি চক্রবর্তী এসে পৌঁছান তারাপাশায়। তারাপাশা তখন মুক্তাঞ্চল। মনু নদীর কোল ঘেষে দাঁড়ানো তারাপাশা হাইস্কুলে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। যেখানে ক্যাম্প ইনচার্জ ছিলেন বেদানন্দ ভট্টাচার্য। মৌলভীবাজার মুক্ত হওয়ার পর তারাপাশার ক্যাম্প গুটিয়ে মৌলভীবাজার সরকারি স্কুলে নিয়ে আসা হয়। ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকায় পাক বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শেষ হয়। অবশেষে এল সেই ভয়াবহ ২০ ডিসেম্বর। মৌলভীবাজার অঞ্চলের বিভিন্ন ক্যাম্পের মুক্তিযোদ্ধারা মৌলভীবাজার সরকারি হাইস্কুলে জমা হতে থাকে। মৌলভীবাজার হাইস্কুল ক্যাম্পের কমান্ডার ইনচার্জ ছিলেন জনাব সলমান চৌধুরী। ২০ ডিসেম্বর কৈলাশর থেকে অর্ডার আসে এখানকার সকল মুক্তিযোদ্ধাদের কৈলাশর যেতে হবে। এ কারণে এবং মার কোলে ফিরে যাবার উদ্দেশ্যেই কমান্ডার সলমান চৌধুরীর নির্দেশে বেদানন্দ ভট্টাচার্য, কুলাউড়ার সফিক, কাজল প্রমুখ একটি পুরাতন মডেলের বাস নিয়ে বের হন বিভিন্ন ব্যাংক, কোট ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সমূহে ডিউটিরত মুক্তিযোদ্ধাদের কালেকশন করে নিয়ে আসতে। বাসে করে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে ঘুরে ঘুরে যখন ফিরছেন তখনই দেখতে পান মৌলভীবাজার কোট প্রাঙ্গণে একটি জঙ্গলাকীর্ণ জায়গায় ট্রাক্টরের একটি ট্রেইলার ভর্তি বিভিন্ন ধরণের বিস্ফোরকের বাক্স। তাতো আর ফেলে আসা যায় না- তাই বিস্ফোরকের বাক্সগুলো বাসে করে নিয়ে ক্যাম্পে ফিরে আসেন তাঁরা। দেশ মাতৃকাকে স্বাধীন করে ছেলেরা ঘরে ফিরে যাবে এ খুশিতে কেউ জটলা করে গল্প করছে, কেউ খাচ্ছে। কোথা থেকে এক জ্যোতিষী এসে ক্যাম্পে উপস্থিত হয়েছিল। তাকে হাত দেখাতে ভীড় করে আছেন সলমান চৌধুরী সহ অনেকেই। বিস্ফোরকের বাক্সগুলো গাড়ি থেকে নামিয়ে স্কুল ভবনের মধ্যে নির্দিষ্ট কক্ষে রাখতে গেলে হঠাৎ বিকট শব্দে বøাষ্ট হয়। সঙ্গে সঙ্গে ২২ জন ও পরে হাসপাতালে আরো ৫ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীন হন। এদের অনেকের শরীরে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। আহত হয় অনেকেই। অফিস রুমে বসে থাকা সলমান চৌধুরীর শরীরও ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। এ অফিস রুমেই জ্যোতিষীকে হাত দেখানোর ভিড়ে বসা ছিলেন রবি চক্রবর্তী। সেও এই ভিড়ে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় শহীদদের শেষকৃত্য হয় স্কুল সংলগ্ন মাঠে। পরে শহীদদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে সেখানে নির্মিত হয় শহীদ মিনার। নানা কান ঘুরে একদিন ছেলের মৃত্যু সংবাদ মায়ের কানে পৌঁছে যায়। শোকে দুঃখে মা আমার পাষাণ প্রতিমা হয়ে যান। 

লাখো শহীদের রক্তে ভেজা স্বাধীন স্বদেশের মাটিতে শহীন হন রবি চক্রবর্তী, কাজল পাল, রহিম বক্স খোকা, আব্দুল বারেক, সলমান চৌধুরীসহ মোট ২৭ জন। আহত হন মায়া মিয়া, শফিকসহ অগণিত বীর মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তির মন্দির সোপান তলে যারা প্রাণ বিসর্জন দিলেন-মৌলবাদ ও বীভৎস সহিংসতা বিদীর্ণ বাংলাদেশ কি তাঁদের কাক্সিক্ষত ছিল? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার দায় আমাদের।


এএফ/০৭