Cinque Terre

মোহাম্মদ বিলাল

৩০ জুন , ২০২৬


সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, এমসি কলেজ
মুরারিচাঁদ কলেজ: একশ চৌত্রিশ বছরের আলোকধারা


ভূমিকা

প্রকৃতির লীলাভূমি সিলেটে একশ চৌত্রিশ বছর ধরে আলোকধারা ছড়িয়ে যাচ্ছে মুরারিচাঁদ কলেজ। এ কলেজের ভূ-বৈচিত্র্য,বিস্তৃত ক্যাম্পাস ও অবকাঠামো যেমন নয়নাভিরাম, তেমনই শিক্ষা ও সংস্কৃতিগত বিকাশধারাও ঐতিহ্যময়। সিলেটের ভূ-প্রকৃতি ছোটো ছোটো টিলা, পাহাড় ও হাওর-বাঁওর দ্বারা বৈচিত্র্যময়। মুরারিচাঁদ দাঁড়িয়ে আছে সিলেট থেকে তামাবিল রাস্তার পাশে, এ অঞ্চলটি মূলত খাসিয়া-জৈন্তিয়া পাহাড়শ্রেণির বিস্তৃত ভূমিরূপের অন্তর্গত। এর ভবনগুলো নির্মিত হয়েছে পাহাড়িয়া ভূমির কোনোরূপ পরিবর্তন না করেই। ফলে কয়েকটি ভবন নির্মিত হয়েছে টিলার ওপর, কয়েকটা রয়েছে সমতলে। এর পুরনো ভবনসমূহের কয়েকটি ভিক্টোরিয়ান স্থাপত্যরীতির, কতকগুলো আসাম-প্যাটার্ন নামে পরিচিত বাঁশ-বেত, কাঠের পেটি-বর্গা, চুন ও সুরকির দ্বারা তৈরি। শাহজালাল-শাহপরান এবং শ্রীচৈতন্যের মরমিয়া জীবনধারায় ¯œাত সিলেটের জনজীবনে মুরারিচাঁদ কলেজ প্রথম উচ্চশিক্ষার দ্বার-উন্মোচন করে। মধ্যযুগে সিলেটে সংস্কৃত-আরবি-ফারসি সাহিত্য, নাগরিলিপিমালা ও সাহিত্যের বিকাশ ঘটে। চতুর্দশ শতকের গোড়ার দিকে হযরত শাহজালালের আগমনের ফলে এখানে ইসলাম ধর্ম-সংস্কৃতি এবং ষোড়শ শতকের মাঝামাঝিতে শ্রীচৈতন্যের আবির্ভাবের ফলে বৈষ্ণব ধর্ম-সংস্কৃতি বিকশিত হয়। উনিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত সিলেটের শিক্ষাব্যবস্থা ছিল সনাতনী অর্থাৎ মসজিদ-মক্তব আর টোলকেন্দ্রিক। ব্রিটিশ শাসনামলে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্যান্য অঞ্চলে যে হারে ইংরেজি শিক্ষার প্রসার ঘটেছিল, সিলেটে সে হারে ঘটেনি। এখানকার শহরাঞ্চলে ১৮৪৪-৫৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত মাত্র তিনটি প্রবেশনারি বিদ্যালয় গড়ে উঠে এবং ১৮৬৯ খ্রিষ্টাব্দে সরকারি হাই স্কুল নামে জেলা হাইস্কুল পুনঃস্থাপনের মাধ্যমে ইংরেজি শিক্ষাবিস্তার ত্বরান্বিত হয়। উনিশ শতকের আশির দশক পর্যন্ত শহরের বাইরে কোনো হাইস্কুল স্থাপিত হয়নি, কোথাও কোথাও ‘মধ্যবঙ্গ’ স্কুল ছিল ইংরেজি শিক্ষার সূতিকাগার। কিন্তু কলেজে পড়তে হলে সিলেটের শিক্ষার্থীদের যেতে হতো ঢাকা, রাজশাহী, কলকাতা বা আলীগড়ে বা অন্য কোথাও। এমতাবস্থায় মুরারিচাঁদ কলেজ প্রতিষ্ঠা ছিল আসামপ্রদেশে রেনেসাঁ সঞ্চারের মতো সুদুরপ্রসারী ঘটনা। ব্রিটিশপর্বে কলেজটির বিদ্যায়তনিক পরিমÐল-পাঠদান ও ফলাফল, সাহিত্য-সংস্কৃতি, ধর্ম-দর্শন-বিজ্ঞানচর্চা এবং রাষ্ট্র ও স্বদেশচিন্তার বিকাশ সেই সাক্ষ্য দেয়।


প্রতিষ্ঠাপর্ব

কালগত দিকটি বিবেচনা করলে দেখা যায় কলকাতা মাদ্রাসা (১৭৮১), সংস্কৃত কলেজ (১৭৯১), ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ (১৮০০) বা হিন্দু কলেজ (১৮১৭), ঢাকা কলেজ (১৮৪১), চট্টগ্রাম কলেজ (১৮৬১), রাজশাহী কলেজ (১৮৭৩), জগন্নাথ কলেজ (১৮৮৩), আনন্দমোহন কলেজ (১৮৮৩), নড়াইল ভিক্টরিয়া কলেজ (১৮৮৬), এডওয়ার্ড কলেজ (১৮৮৯), ব্রজমোহন কলেজের (১৮৮৯) পরে প্রতিষ্ঠিত হয় মুরারিচাঁদ কলেজ (১৮৯২)।রাজা গিরিশচন্দ্র রায় বর্তমান সিলেট সিটি কর্পোরেশনসংলগ্ন রাজা জিসি হাই স্কুলে ১৮৯২ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ জুন মুরারিচাঁদ কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। এই স্কুলটির তখনকার নাম ছিল ‘মুরারিচাঁদ হাই স্কুল’;তিনি ১৮৮৬ খ্রিষ্টাব্দে নিজের মাতামহের নামে স্থাপন করেছিলেন। ১৮৯১ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর চেষ্টায় সেই স্কুলে কলেজ শাখা চালু করার জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় অনুমতি প্রদান করে এবং উপরোল্লিখিত সন-তারিখে ‘মুরারিচাঁদ কলেজ’ নামে অ্যাকাডেমিক যাত্রা শুরু করে। কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রায় দুই দশক পর্যন্ত পাঠদান চলে সেই স্কুলগৃহ ও এর সম্মুখবর্তী ত্রিভুজাকৃতির গোবিন্দচরণ পার্কে (বর্তমানে হাসান মার্কেট) নির্মিত বাঁশবেতের দ্বারা মাচান বা টং ঘরে। রাজা গিরিশচন্দ্র রায় আমৃত্যু কলেজটির পৃষ্ঠপোষকতা করেন। ১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর মৃত্যুতে কলেজ পরিচালনায় আর্থিক সংকট দেখা দেয়। এসময় ছাত্রসংখ্যার অবনতি, কলকাতা বিশ্ববিশ্ববিদ্যালয়ের রেগুলেশন পরিবর্তন (বিশ্ববিদ্যালয়ের রেগুলেশন এ্যাক্ট ১৯০৬), গৌহাটিতে কটন কলেজ (১৯০১) স্থাপন করে সেটিকে প্রথম শ্রেণিতে উন্নয়নের জন্য অহমিয়াদের প্রচেষ্টা প্রভৃতি কারণে মুরারিচাঁদ কলেজের অস্তিত্বই সংকটে পড়ে। অবশ্য গিরিশচন্দ্র রায় তাঁর মৃত্যুর পূর্বে কলেজটির জন্য সরকারি সাহায্য চেয়ে আবেদন করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর স্থানীয় নেতৃবৃন্দ সেই দাবি আদায়ে সোচ্চার হোন। এ অবস্থায় ১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দে সরকার মাসিক ৫০০ টাকা গ্রান্ট-ইন-এইড প্রদান করে এবং কলেজকে সরকারিকরণে সম্মত হয়। তবে এই দাবি আদায়ের জন্য সিলেটবাসীকে প্রায় দশ বছর আন্দোলন ও দুবছরের কলেজ পরিচালনব্যয়ের অর্ধেক অর্থদান করতে হয়। স্থানীয় চাহিদা ও দাবির প্রেক্ষিতে সরকারি অনুদানের পাশাপাশি নতুন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয় এবং এর ফলে কলেজের ছাত্রসংখ্যা ও ফলাফলের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য হারে উন্নতি ঘটে। ১৯১১ খ্রিষ্টাব্দে ডিপিআই হলওয়ার্ড পরিদর্শন প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন যে, যেসব ক্ষেত্রে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে গড় পাসের হার ছিল শতকরা ৪৯, সেসব ক্ষেত্রে মুরারিচাঁদ কলেজের পাসের হার ছিল শতকরা ৭০। কলকাতা বিশ^বিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোর মধ্যে মুরারিচাঁদ কলেজের অবস্থান বরাবর শীর্ষপর্যায়েই ছিল। ১৯২০-২১ শিক্ষাবর্ষের ফলাফলে দেখা যায়, আইএ পরীক্ষায় ১০৭ জন অংশগ্রহণ করে  প্রথম বিভাগে ৪১জন, দ্বিতীয় বিভাগে ৩৬জন, তৃতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হন ১৭জন। এদের মধ্যে উনিশজন ডিস্টিংশন লাভ করেন। এভাবে আইএসসি পরীক্ষায় যথাক্রমে ৩৩জন অংশগ্রহণ করে ২২জন প্রথম বিভাগ, ৮জন দ্বিতীয় বিভাগ, ১জন তৃতীয় বিভাগে পাশ করেন। এদের মধ্যে ১১৬জন ডিস্টিংশন লাভ করেন। অর্থাৎ পাশের হার ছিল যথাক্রমে ৮৭.৮৫ ও ৯৩. ৯৪। পরবর্তীকালে ¯œাতকশ্রেণিতে উন্নীত হওয়ার পরও কলেজের ফলাফলের এই ধারাবাহিকতা বজায় ছিল। সাতচল্লিশের দেশভাগ ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালীন পরিস্থিতির কথা বাদ দিলে শিক্ষাগত পরিবেশ ও ফলাফলের দিক থেকে দেশের অন্যান্য কলেজের মধ্যে মুরারিচাঁদ কলেজ এখনো শীর্ষ অবস্থান অক্ষুণœ রেখেছে। সাতচল্লিশের দেশভাগ ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে শিক্ষক ও ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা কমে যায়, ফলাফলেও অবক্ষয় দেখা দেয়। অধ্যাপক আবদুল আজিজ তার ‘মুরারিচাঁদ কলেজের ইতিকথা’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে মুক্তিযুদ্ধের সময় কলেজটি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনির টার্গেটে পরিণত হয়। বোমা ও গুলি বর্ষণের ফলেলাইব্রেরি ভবন, রসায়নের গবেণাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রশাসসিক ভবন, ছাত্রবাসের মিলনায়তন, আসবাবাপত্র পুড়িয়ে দেওয়া হয়। আসাম প্যাটার্নের অনিন্দ্যসুন্দর ছাত্রাবাসটি ২০১২ সালের আট জুলাই আবার বর্বরতার শিকার হয়, কয়েকটি ব্লক ছাত্ররাজনীতির কোন্দলের আগুন দ্বারা দুষ্কৃতিকারীরা পুড়িয়ে দেয়।  


এমসি কলেজের প্রধান ফটক। 

সূচনাকালে মুরারিচাঁদ কলেজ কলাবিষয়ক ঝবপবড়হফ-মৎধফব কলেজ হিসেবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয়। তখন শিক্ষক ছিলেন চার জন, ছাত্র আঠারো জন। প্রথম পাঁচ বছরে এফএ পাস করেন চব্বিশ জন। কলেজকে সরকারিকরণ, ভরৎংঃ-মৎধফব(প্রথম শ্রেণি) কলেজে উন্নীতকরণ এবং স্নাতক কোর্স চালু করার দাবিতে স্থানীয় জনগণ আন্দোলন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৯১২ খ্রিষ্টাব্দের ১এ প্রিল আসামের তৎকালীন চিফ কমিশনার স্যার আর্চডেল আর্ল কলেজটিকে সরকারিকরণ ও ভরৎংঃ-মৎধফব কলেজে উন্নয়নের ঘোষণা দেন। এ ঘোষণার পর তৎকালীন গোবিন্দচরণ পার্কে (বর্তমান হাসান মার্কেট) বাঁশ-বেতের মাচানের ওপর নলখাগড়ার বেড়া দিয়ে কলেজ ভবন তৈরি করা হয়। কিন্তু বিজ্ঞানাগারের জন্য ব্যবহার করা হয় রাজা গিরিশচন্দ্র স্কুল। তবে গ্রেড-উন্নয়ন ও সরকারিকরণের ঘোষণাটা সহজেই আসেনি এবং সহসাই বাস্তবায়িত হয়নি। এজন্য স্থানীয় জনগণ ও নেতৃবৃন্দর সহযোগিতায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন খান বাহাদুর আবদুল মজিদ সিআইই (কাপ্তান মিয়া)। ১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারিতে মুরারিচাঁদ কলেজ প্রথম শ্রেণির কলেজ হিসেবে সেক্রেটারি অব স্টেটের অনুমতি লাভ করলেও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণে কলেজের জন্য প্রকল্প প্রণয়ন- নতুন স্থান নির্বাচন, ভূমি অধিগ্রহণ, ভবন-নির্মাণ ও ডিগ্রি কোর্স চালুকরণসহ সব নতুন কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। এতে জনমনে অসন্তোষ তৈরি হয়। এসময় জননেতা আবদুল মজিদের নেতৃত্বে আসাম সরকারের নিকট একটি স্মারকলিপি প্রদান করা হয় এবং কামিনীকুমার চন্দ ভারত সরকারের সচিব স্যার অ্যাডওয়ার্ড ম্যাগলাগান ও শিক্ষা সদস্য স্যার সংকর নায়ারের সঙ্গে এ বিষয়ে সাক্ষাৎ করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে আসামের চিফ কমিশনার স্যার আর্ল প্রস্তাব করেন যে যদি স্থানীয় ব্যক্তিবর্গ ডিগ্রি কোর্স চালুর প্রথম দুবছরের খরচের অর্ধেক প্রদান করেন তবে সরকারের পক্ষে তা সম্ভব হবে। খান বাহাদুর সৈয়দ আবদুল মজিদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভারসিদ্ধান্তক্রমে খান বাহাদুর সৈয়দ আবদুল মজিদ, রায় বাহাদুর নলিনীকান্ত দস্তিদার, রায় বাহাদুর বৈকুণ্ঠনাথ শর্মা, খান বাহাদুর হাজি মোহাম্মদ বক্ত মজুমদার, বাবু সারদাচরণ শ্যাম, বাবু রাধাবিনোদ দাস, রায় বাহাদুর সুখময় চৌধুরী, রায় বাহাদুর প্রমোদচন্দ্র দত্ত, বাবু হরেন্দ্র চন্দ্র সিনহা আঠারো হাজার টাকা প্রদান  করেন। এই অসামান্য দানে তখন প্রথম ফার্স্ট-গ্রেডের কলেজে উন্নীত হয়। 

গোবিন্দচরণ পার্কে কলেজের নিজস্ব ভ‚মি ও প্রয়োজনীয় ভবন ছিল না। কলেজটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের বৃহৎ পরিকল্পনা গ্রহণের প্রয়োজন দেখা দিল। এ লক্ষ্যে খান বাহাদুর সৈয়দ আবদুল মজিদ তৎকালীন চিফ কমিশনার এনডি বিটসন বেল ও অন্যান্য শিক্ষানুরাগীবৃন্দ থ্যাকারে টিলায় কলেজের জন্য নতুন স্থান নির্বাচন করেন। ভাইসরয় লর্ড চেমসফোর্ড ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দে সিলেট সফরে এসে স্থানটি পরিদর্শন করে পছন্দ করে কলেজের জন্য প্রণীত পরিকল্পনাটি সংশোধন করার পরামর্শ দেন। কলেজ নির্মাণের জন্য একশত পঞ্চাশ একর ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়। ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দে খান বাহাদুর সৈয়দ আবদুল মজিদ সিআইই আসামের শিক্ষামন্ত্রী নির্বাচিত হলে ১৯ আগস্ট গভর্নর স্যার উইলিয়াম মরিসকে দিয়ে থ্যাকারে টিলায় (বর্তমান স্থানে) কলেজের প্রশাসনিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করিয়ে নেন। তিনি পরলোক গমন করলে (২৯ জুন ১৯২২) তার স্থলাভিষিক্ত শিক্ষামন্ত্রী প্রমোদচন্দ্র দত্ত সিআইই কলেজের অগ্রগতি ত্বরান্বিত করেন। মোট ৮,৮১,৩৯৯ টাকা ব্যয়ে কলাভবন (দুতলা), লাইব্রেরি হল, প্রশাসনিক ভবন, লেকচার থিয়েটার ও পদার্থবিদ্যা বøক, অধ্যক্ষের বাসভবন, ছাত্রাবাস, খেলার মাঠ ও প্যাভেলিয়ন, পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন প্রণালী নির্মাণ করা হয়। দশ শয্যাবিশিষ্ট একটা হাসপাতাল নির্মাণ করা হয় হোস্টেলে যা সাধারণত কোনও কলেজে নেই। ১৯২৫ সালের ২৭ আগস্ট তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী সাদুল্লাহ এবং অন্যান্যদের নিয়ে আসামের ভারপ্রাপ্ত গভর্নর স্যার উইলিয়াম রিড কলেজের লাইব্রেরি হলে উদ্বোধন করেন। এ কলেজের ভবনসমূহ ভিকটোরিয়ান স্থাপত্যশৈলী অনুসরণ করে নির্মিত হয়। কলাভবনের বিপরীতে সমতল জায়গায় বিজ্ঞান বিষয়ের কøাসরুম ও ল্যাবরেটোরির জন্য নির্মিত হয় আসামটাইপ ভবন।

মুরারিচাঁদ কলেজের লাইব্রেরি বিষয়ে আলাদাভাবে বলতে হয়। এর আয়তন ৩৮৭০ বর্গ ফুট। এতে ১০০০ শিক্ষার্থী বসার ব্যবস্থা রাখা হয়, দেয়ালে দেয়ালে সংযুক্ত করা হয় বই রাখার সুউচ্চ দৃষ্টিনন্দন আলমারি। গড়ে তোলা হয় বইপুস্তক ও পত্রপত্রিকার বিপুল সমাহার। ফলে ১৯২৬ সালে কলেজ লাইব্রেরিতে বইপত্রের সংখ্যা দাঁড়ায় ৭০০০-এ এবং ১৯৪০ সালে তা উপনীত হয় ১২১৮৭ কপিতে। পুরাতন বইপত্রের এত বিপুল সমাহার এখন অবশ্য লাইব্রেরিতে নেই, মুক্তিযুদ্ধে পাক-হানাদার দ্বারা যেমন ক্ষতিগ্রস্থ হয় তেমনই অন্যান্যভাবেও ক্ষতিগ্রস্থ হয়।


অধিভুক্তি, পাঠদানের শ্রেণি ও বিষয়

মুরারিচাঁদ কলেজ ১৮৯২-১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং ১৯৪৭-১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং ১৯৬৮-৯১ খ্রি. পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ছিল। ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয়। উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণিতে বিজ্ঞান শাখা চালু হয় ১৯১৩-তে; পাঠ্যবিষয় ছিল ইংরেজি, মাতৃভাষা, অংক, যুক্তিবিদ্যা, রসায়নবিদ্যা, সংস্কৃত, ফারসি, ইতিহাস ও পদার্থবিদ্যা। ১৯১৬-তে চালু হয় বিএ; পাঠ্যবিষয় ছিল ইংরেজি, মাতৃভাষা, গণিত, ইতিহাস, দর্শন, সংস্কৃত ও ফারসি। বিএসসি চালু ১৯২৬ সালে। এ-সময় ডিগ্রি ক্লাসে পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়ন বিষয় অনুমোদিত হয়। ১৯১৮-তে সংস্কৃতে এবং ১৯২২-এ ইংরেজি, গণিত, ইতিহাস, দর্শন, ফারসি, আরবিতে এবং ১৯২৭-এ পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও গণিতে চালু হয় অনার্স কোর্স। পাকিস্তান সৃষ্টির কয়েক বছর পর ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন মুরারিচাঁদ কলেজ থেকে সাময়িকভাবে অনার্স কোর্স তুলে নেওয়া হয়। তবে ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে পুনরায় ইংরেজি, বাংলা, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি, গণিত, পদার্থবিদ্যা, রসায়নবিদ্যা অনার্স কোর্স প্রবর্তিত হয়। ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে মুরারিচাঁদ কলেজ নবপ্রতিষ্ঠিত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয় এবং ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে এখানে ইংরেজি, বাংলা, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি ও গণিতে মাস্টার্স ১ম পর্ব শিক্ষা কার্যক্রম চালু হয়। কিন্তু স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে প্রধানত শিক্ষক স্বল্পতার কারণে মাস্টার্স প্রথমপর্ব কোর্স বিলুপ্ত হয়। অপর দিকে ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে উদ্ভিদবিজ্ঞান, ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে প্রাণিবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান অনার্স কোর্স চালু হয়। পরবর্তীকালে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে মাস্টার্স কোর্স প্রবর্তিত হয়। ২০০৪-২০০৫ শিক্ষাবর্ষ থেকে চালু হয় মনোবিজ্ঞান, ইতিহাস, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি এবং পরিসংখ্যান বিষয়ে অনার্স। বর্তমানে মানবিক ও বিজ্ঞান অনুষদ মিলিয়ে অনার্স কোর্স চালু আছে পনেরোটি বিষয়ে, মাস্টার্স আছে ষোলোটিতে। ইসলাম শিক্ষা বিষয়ে শুধু মাস্টার্স কোর্স চালু রয়েছে। শিক্ষার্থী রয়েছে প্রায় পনেরো হাজার। কিন্তু সীমাবদ্ধতা রয়েছে একটি জায়গায়, এই খ্যাতনামা কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক, ¯œাতক বা ¯œাতকোত্তর পর্যায়ে বাণিজ্য ও ব্যবসায় শিক্ষা শাখা নেই। এক সময় এখানে বাণিজ্য ও ব্যবসায় শিক্ষা শাখা ছিল, এটি চালু করার দাবি অনেক দিনের।

বিদ্যায়তনিক পরিমণ্ডল

এ কলেজের বিদ্যায়তনিক পরিমণ্ডল রীতিমত বিস্ময় জাগানিয়া। ব্রিটিশ শাসনামলেইকলেজের অভ্যন্তরে সংঘটিত শিক্ষা ও সহপাঠক্রমিক অনন্য উচ্চতায় আরোহণ করে। তখন ছাত্রদের তত্ত্বাবধানের জন্য প্রক্টরিয়াল শিক্ষকগণ ছাত্রদের নিজবাড়ি, হোস্টেল, মেসবাড়ি বা অন্যরূপ বাসস্থান পর্যন্ত গিয়ে তত্ত¡াবধান করতেন। তখন শিক্ষার্থীদের প্রতিভার বহুমুখি বিকাশ সাধন করতে কলেজে ছাত্র-সংসদসহ নানাবিধ সংগঠনতৈরি করা হয়েছিল। ১৯২১-২২ শিক্ষাবর্ষ থেকে ‘The Murarichand College Union’ নামে ছাত্র-সংসদ গঠনের ব্যবস্থা করা হয় যাতে ১৯২৩-৩৯ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত ছাত্র-সংসদ কাজ করে। সিলেট অঞ্চলে প্রাদেশিক নির্বাচনের পরেই মুরারিচাঁদ কলেজ ছাত্র-সংসদের নির্বাচনী আমেজ ও প্রভাব ছিল বলে অনেকেই স্মৃতিচারণ করেছেন। সেকালে শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে ‘The Students Mutual Aid Fund’; ‘The Murarichand College Theatre’‘TheMurarichand College Athletic Society’; ‘The Murarichand College Debeting Club’; ‘The Murarichand College Swimming Club’; ‘The Murarichand College Literery Club’; ‘The Murarichand College Literary Club’; ‘The Murarichand College Singing Club’; ‘The Murarichand College Rover Scout’; ‘The Murarichand College Cycling Club’; ‘The Murarichand College Nursing Unit  কাজ করত। স্বাধীনতা পরবর্তী ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দে কলেজ ইউনিয়নের সাধারণ সভায় প্রফেসর এন সি শীলের সভাপতিত্বে Old Boys নামে কলেজের অ্যালোমনাই গঠিত হয় বলে জানা যায়। সাতচল্লিশের পরে অবশ্য এর অস্তিত্ব বজায় থাকেনি। ১৯৯১-৯২ শিক্ষাবর্ষ পর্য়ন্ত মুরারিচাঁদ কলেজে নির্বাচিত ছাত্র-সংসদ কার্যকর ছিল। পাকিস্তান আমল বা স্বাধীনতা-উত্তর কালে কোনো অ্যালমনাই গড়ে না উঠলেও রোবার স্কাউট ও সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চার প্লাটফর্মগুলো বরাবরই সক্রিয় ছিল। বিশ শতকের শেষ দিক থেকে সাম্প্রতিক কাল পর্যন্ত কলেজের পৃষ্ঠপোষকতায় এখানে ‘থিয়েটার মুরারিচাঁদ’, ‘মুরারিচাঁদ ডিবেটিং সোসাইটি’, ‘বিজ্ঞান ক্লাব’, ‘মুরারিচাঁদ রিপোর্টার্স ইউনিটি’, ‘মুরারিচাঁদ কবিতা পরিষদ’, ‘মুরারিচাঁদ কলেজ যুব রেড ক্রিসেন্ট ইউনিট’, ‘মোহনা’, ‘ঐকতান’, ‘ট্যুরিস্ট ক্লাব অব মুরারিচাঁদ কলেজ’,‘বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি)’, ‘‘ধ্রুব ক্লাব’, ‘কেমেস্ট্রি ক্লাব’, ‘ফিজিক্স ক্লাব’, ‘স্ট্যাটিস্টা’, ‘রাষ্ট্রবিজ্ঞান সোসাইটি’, ‘মনোবিকাশ সোসাইটি’, ‘ইকোনমিক্স ক্লাব’, ‘দ্যা স্কাইলার্ক ক্লাব অব ইংলিশ’, ‘ইতিহাস ফোরাম’, ‘ইসলামের ইতিহাস ছাত্রকল্যাণ ফোরাম’, ‘চেতনা সংঘ’  নামে সংগঠনগুলো সহশিক্ষা কার্যক্রমে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।

প্রকাশনা : ব্রিটিশ শাসনামলে মুরারিচাঁদ কলেজের মুখপত্র হিসেবে The Murarichand College Magazine নামে একটি ত্রৈমাসিক জার্নাল ১৯১৭-৩৯ পর্যন্ত একটানা তেইশ বছর বের হয়। প্রথম কয়েক বছর এটি পাঁচ থেকে আট সংখ্যা পর্যন্ত বেরিয়েছিল। এতে বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের গবেষণামূলক ও সৃজনশীল লেখা  কাব্য ও প্রবন্ধসাহিত্য, ইতিহাস-দর্শন-ধর্মতত্ত¡, রাজনীতি-অর্থনীতি-বিজ্ঞান ও সমকালীন বিষয়সহ সৃজনশীল রচনা, সম্পাদকীয় ও কলেজের ফলাফল ও অন্যান্য কার্যক্রমের প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ১৯৪২ সালে দুখন্ডে প্রকাশিত হয় The Murarichand College Golden Jubilee Volum. এই বিদ্যায়তনটিতে ১৮৯২-১৯৪৭ কালপর্বে একদল বিজ্ঞান-লেখক গড়ে উঠেন যারা এই প্রতিষ্ঠানেরই ছাত্র অথবা শিক্ষক ছিলেন। ‘শব্দ রহস্য’; ‘আলোক-রশ্মির অপবর্তন’; ‘বায়ুমণ্ডলীয় তড়িৎ’; ‘Progressive Development of the Theory of Light’; ‘The Banana and its Uses’; ‘স্বপ্ন’; ‘মন ও আমরা’ প্রভৃতি প্রবন্ধে তাদের বিজ্ঞানচিন্তার প্রকাশ ঘটেছে। তখন জার্নালটিকে ঘিরে বিকশিত হয়ে উঠেন তুখোড় কবি, প্রাবন্ধিক ও গল্পকার যাঁদের রচনার ভিত্তি ছিল সুরমা-বরাক উপত্যকার জনজীবন-প্রেম ও মানবতাবোধ, সমাজ ও সংস্কৃতি, স্থানীয় প্রকৃতি ও পরিবেশ। নিঃসন্দেহে উনিশ শতকের শেষার্ধ ও বিংশ শতকের প্রথমার্ধের সুরমা-উপত্যকার জনজীবনই ছিল রচনাগুলোর পটভূমি, মূল প্রেরণা ছিল আত্ম-আবিষ্কার। আধুনিক শিক্ষার আলোকসম্পাত তখন শহরজীবন হতে গ্রামীণ জীবনে পড়তে শুরু করেছে। এ-সময় সামাজিক প্রথাপদ্ধতি, লোকবিশ্বাস, আদর্শ, জীবনবোধ ও আকাক্সক্ষার ক্ষেত্রে পরিবর্তন সূচিত হওয়ায় নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণি তৈরি হয়। মুরারিচাঁদ কলেজ ম্যাগাজিন-এ প্রকাশিত গল্পসমূহের দিকে তাকালে মনে হয় গল্পকারেরা তাঁদের রচনায় এই জনপদে নতুন জীবনচিন্তা-সামন্ততান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির বদলে সর্বজনীন মানবতাবোধ ও স্বাধীন জীবনচিন্তাকে ধারণ করেছেন এবং ছড়িয়ে দিয়েছেন। এসব গল্প-কবিতা-প্রবন্ধের বেশির ভাগই বিষয়গুণ ও বুননকৌশলের দিক থেকে কালোত্তীর্ণ। কিন্তু সুরমা-বরাক উপত্যকা বা তৎকালীন সিলেট জেলাকে যেহেতু বঙ্গভুমি হতে বিচ্ছিন্ন করে যুক্ত করা হয়েছিল আসাম প্রদেশের সঙ্গে, সেহেতু এ-সময়কালের জীবনবোধ, ভাষা ও সাহিত্যচিন্তাও বাংলা সাহিত্যের মূলধারায় যুক্ত হয়নি। ফলে বাংলা সাহিত্যধারায় এই লেখক ও চিন্তকগণ থেকে গিয়েছেন নেপথ্যে এবং সুরমা-উপত্যকায় তাঁরা যে জীবন বদলানোর চিত্র এঁকেছেন তা এক রকম অনালোচিতই থেকে গিয়েছে। সে সময়ের কলেজ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত কবিতা ও প্রবন্ধাবলির ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে। তখন জুরি বোর্ডের মাধ্যমে কলেজ ম্যাগাজিনের প্রতিটি সংখ্যার শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ ও কবিতা নির্বাচন করে স্বতন্ত্রভাবে পনেরো টাকা করে পুরস্কার প্রদান করা হতো। এ চিত্র আজকাল কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আছে বলে ভাবা যায় না। ব্রিটিশ শাসনামলের কলেজ ম্যাগাজিনের যে কয়েকটা পাওয়া গিয়েছে, তাতে সেকালের সুরমা-উপত্যকার জনজীবন ও রেনেসাঁপ্রয়াস এবং শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সৃজনপ্রয়াসের বিস্ময়কর পরিচয় বিদ্যমান। সাতচল্লিশের পর হতে কলেজের মুখপত্রটি কখনও The Murarichand College Magazine  নামে, কখনও ‘মুরারিচাঁদ কলেজ বার্ষিকী’ নামে অনিয়মতভাবে প্রকাশিত হয়; মুক্তিযুদ্ধের পর হতে ‘পূর্বাশা’ নামে অনিয়মিতভাবেই প্রকাশিত হয়ে আসছে। ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দ হতে প্রকাশিত হচ্ছে গবেষণাপ্রত্রিকা ‘মুরারিচাঁদ কলেজ জার্নাল’ (আইএসএসএন ২৭০৭-৯২০১)। এছাড়াও কলেজের পৃষ্ঠপোষকতায় বিভিন্ন বিভাগ ও সাংস্কৃতিক সংগঠন সাময়িকী প্রকাশ করে থাকে। সময় সময় শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক সেমিনার,  পহেলা বৈশাখ, বসন্তবরণ প্রভৃতি অনুষ্ঠান উদ্যাপন করা হয়। ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দে রবীন্দ্র-আগমনের শতবর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে দুদিনব্যাপী একটি আন্তর্জাতিক সেমিনারে আয়োজন করা হয়। 


মুরারিচাঁদ কলেজের প্রাক্তনী

মুরারিচাঁদ কলেজের শিক্ষার্থীগণ মুরারিয়ান নামেই পরিচিত। শত বছর পেরিয়ে মুরারিয়ানগণ এতদঞ্চলে তো বটেই, দেশ ও বহির্বিশে^ অনন্য অবদান রেখেছেন। প্রধানত শিক্ষাবিদ- প্রকৌশলী-ডাক্তার, ব্যুরোক্রেট-কুটনীতিক, রাজনীতিবিদ-জনপ্রতিনিধি-মন্ত্রী, দার্শনিক-প্রতœতাত্তি¡ক-ঐতিহাসিক, কবি-লেখক-গবেষক, পত্রপত্রিকার সম্পাদক-বিজ্ঞানবিষয়ক গবেষক, অর্থনীতিবিদ-বিচারপতি-আইনজীবী হিসেবেতাঁদের অনন্য অবদান রয়েছে। প্রসঙ্গক্রমে আলতাফ হোসেন, নীহার রঞ্জন রায়, প্রবোধ চন্দ্র সেন, আবদুল মতিন চৌধুরী, আব্দুল হামিদ, মজদউদ্দিন আহমদ, সত্যেন্দ্র কুমার রায়, সৈয়দ মুর্তজা আলী, সয়ফুল আলম খান, যতীন্দ্র মোহন ভট্টাচার্য, দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ, কমলাকান্ত গুপ্ত চৌধুরী, অশোক বিজয় রাহা, দেওয়ান আব্দুর রব চৌধুরী, শাহেদ আলী, মঞ্জুশ্রী চৌধুরী, আবদুস সামাদ আজাদ, দেওয়ান ফরিদ গাজী, মেজর জেনারেল মাহমুদুর রহমান চৌধুরী, কর্নেল তাহের, রাজিউর রহমান, শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ, নুরুর রহমান চৌধুরী, তাসাদ্দুক আহমদ, মোহম্মদ আবদুর রব বীরোত্তম, আখলাকুর রহমান, শাহ এসএম কিবরিয়া, কাজী ফজলুর রহমান, দিলওয়ার, আবুল মাল আবুল মুহিত, এম. সাইফুর রহমান, খন্দকার রহুল কুদ্দুস, প্রসূন কান্তি রায় (বরুণ রায়), কাজী আব্দুল মান্নান, মাহমুদুল আমিন চৌধুরী, আতাউর রহমান চৌধুরী, সদরুদ্দিন আহমদ চৌধুরী, মোহাম্মদ হাবিুবুর রহমান, মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন, মোফাজ্জল করিম, নুরুল ইসলাম নাহিদ, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম প্রমুখের নাম উল্লেখ করা যায়। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, যথা-খেলাফত-অসহযোগ-সত্যাগ্রহ আন্দোলন এবং পরবর্তীকালে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে এ কলেজের ছাত্রশিক্ষক অনন্য অবদান রয়েছে। 


বিশিষ্টজনের আগমন

ব্রিটিশ পিরিয়ডে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে কলেজ ছাত্রবাসে, সরোজিনী নাইডু ও জওহরলাল নেহুরুকে কলেজ-ক্যাম্পাসে সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। স্বাধীনতা-উত্তরকালে, ১৯৭৮ খ্রিষ্টাব্দে মরহুম রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমান একটি জনসভা থেকে ফেরার পথে ছাত্র-শিক্ষকদের আমন্ত্রণে কলেজে পদার্পণ করেন এবং কলাভবনে উঠার সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশ্যে সংক্ষিপ্ত ভাষণ প্রদান করেন। সে সময় তিনি চারটি টিভি, একটি বাস ও একটি মাইক্রোবাস ও  ক্রীড়া সামগ্রী কেনা জন্য অর্থ মঞ্জুর করেন। ১৯৮৫ সালে রাষ্ট্রপতি জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ সিলেটে বিশ^বিদ্যালয় স্থাপনের জন্য স্থান নির্বাচনের উদ্দেশ্যে মুরারিচাঁদ কলেজের অধ্যক্ষের বাসভবনের পাশের টিলায় আগমন করেন। কৃতী মুরারিয়ান আবুল মাল আবুল মুহিত, এম. সাইফুর রহমান, এ কে আবদুল মোমেন প্রমুখ ব্যক্তিগণ তাঁদের মন্ত্রীত্বকালে একাধিকবার কলেজ শুভাগমন করেন এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নমূলক প্রকল্পে করেন যুক্ত করেন।


সমাপন

শান্ত-স্নিগ্ধ সুন্দর ক্যাম্পাস মুরারিচাঁদ কলেজের। আছে বিচিত্র প্রজাতির গাছগাছালি ও ফলজ বৃক্ষ। শত বছর পেরিয়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে সবুজের সমারোহ আর আলোকধারা। একটি প্রদর্শনী চা-বাগান আছে কলেজের প্রশাসনিক ভবনের সামনে, একটি বিপণœ প্রজাতির উদ্ভিদের বাগান লাগিয়ে সংরক্ষণ করা হয়েছে অ্যাকাডেমিক ভবনের সামনের টিলার পাদদেশে, রসায়নভবনের বিস্তৃতপ্রাঙ্গন জুড়ে তৈরি করা হয়েছে শতাধিক প্রজাতির দেশীয় ফলজ বৃক্ষের বাগান, যেন বৃক্ষরাজি ও পশুপাখিদের এক অভয়ারণ্য। শিক্ষার্থীরা এখানে শুধু জ্ঞান আহরণ করে না, জগত ও জীবনের প্রতি যতœশীল হওয়ার শিক্ষাটাও পায়।




এএফ/০১