শান্তিগঞ্জে উজিরের মৃত্যু: বেড়েছে তদন্ত কমিটির সময়

শান্তিগঞ্জ প্রতিনিধি


ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২২
১২:১১ অপরাহ্ন


আপডেট : ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২২
১২:১৪ অপরাহ্ন



শান্তিগঞ্জে উজিরের মৃত্যু: বেড়েছে তদন্ত কমিটির সময়

সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ থানায় নির্যাতনে চুরির মামলার আসামি উজির মিয়ার মৃত্যুর অভিযোগ তদন্তে সময় আরও তিন দিন বাড়ানো হয়েছে। জেলা প্রশাসনের গঠিত কমিটির প্রধান শুক্রবার সময় বাড়ানোর তথ্য জানিয়েছেন।

বৃহস্পতিবার বিকেলে এ সময় বাড়ানোর আবেদন করেন তিনি। এ ছাড়া ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন না পাওয়ায় পুলিশের পক্ষ থেকে গঠিত কমিটিও তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়নি। কমিটি দুটিকে ২৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছিল।

্ শুক্রবার দুপুরে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আনোয়ার-উল-হালিম ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) আবু সাঈদ।

জেলা প্রশাসন গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আনোয়ার-উল-হালিম বলেন, ‘আমরা সময় চেয়েছি। আরও তিন কার্যদিবস সময় বাড়ানো হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে আমরা তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেব।’

প্রাথমিকভাবে নির্যাতনের সত্যতা পাওয়া গেছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটি এখন বলতে পারছি না। আমরা অনেকগুলো বিষয় নিয়ে কাজ করছি, তাই সময় লাগছে। আমাদের তদন্ত চলমান রয়েছে।’

পুলিশের পক্ষ থেকে করা তদন্ত কমিটিও প্রতিবেদন জমা দেয়নি। এই কমিটির প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) আবু সাঈদ জানান, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট না আসায় প্রতিবেদন জমা দেওয়া যায়নি।।

তিনি বলেন, ‘উজির মিয়ার মৃত্যুর ঘটনার ময়নাতদন্ত রিপোর্ট আমরা এখনো পাইনি। রিপোর্ট পেয়ে গেলে আমরা তদন্ত রিপোর্ট জমা দেব। এ জন্য আমাদের কিছুটা সময় লাগছে।’

সুনামগঞ্জ সিভিল সার্জন আহমদ হোসেন শুক্রবার বিকেলে বলেন, ‘ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্ট পেয়েছি। তবে বিস্তারিত প্রতিবেদন পেতে আরও কয়েক দিন সময় লাগবে।’

উজির মিয়ার পরিবারের অভিযোগ

৯ ফেব্রুয়ারি রাতে সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জের পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নের শত্রুমর্ধন গ্রামের যুবক উজির মিয়াকে বাড়ি থেকেই মারতে মারতে পুলিশ থানায় নিয়ে যায় বলে অভিযোগ পরিবারের।

পরে উজির মিয়াকে থানায় নিয়েও ব্যাপক নির্যাতন করা হয় বলে জানান তারা। পরদিন তাকেসহ চারজনকে গরু চুরির মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। ওই দিনই আদালত থেকে উজির মিয়াসহ তিনজন জামিনে ছাড়া পান। শামীম মিয়া নামে একজনকে কারাগারে পাঠায় আদালত।

পরিবারের সদস্যরা জানান, জামিন পাওয়ার পর উজিরকে বাড়িতে আনা হয়। তখন তার শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল। তিনি দাঁড়াতে ও কথা বলতে পারছিলেন না। এরপর গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

সেখানে দুই দিন চিকিৎসার পর কিছুটা সুস্থ হলে তাকে আবার বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। সোমবার সকালে তিনি আবার অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে স্থানীয় কৈতক হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে। থানা পুলিশ মামলা না নিলে তারা আদালতে যাবেন।

ঘটনার সূত্রপাত যেভাবে

গত ১৩ জানুয়ারি গো-চারণ ভূমি থেকে আমরিয়া গ্রামের নুর উদ্দিনের একটি গরু হারায়। পরে খবর আসে যে পাশের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার এক বাজারে গরু ও অটোরিকশাসহ চারজনকে আটক করেছে স্থানীয়রা।

শান্তিগঞ্জ (দক্ষিণ সুনামগঞ্জ) থানার এসআই দেবাশীষসহ কয়েকজন পুলিশ নিয়ে ঘটনাস্থলে যান নুর উদ্দিন। সেখান থেকে গরু ও অটোরিকশা উদ্ধার এবং চারজনকে আটক করে থানায় নিয়ে আসে পুলিশ।

পরদিন এই চারজনসহ অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করে থানায় গরু চুরির মামলা করেন নুর উদ্দিন। মামলার আসামিরা হলেন- আমরিয়া গ্রামের মোস্তাকিম মিয়া, ছাদিকুর রহমান, সালমান হোসেন ও আব্দুল মোতালিব।

আপসে নিষ্পত্তি

নুর উদ্দিন থানায় যখন মামলা করেন তখন সেখানে উপস্থিত ছিলেন একই এলাকার মতচ্ছির আলী। মামলার চার নম্বর সাক্ষী তিনি।

বৃহস্পতিবার তিনি বলেন, ‘নুর উদ্দিন মামলা করতে চাননি। কিন্তু পুলিশ জানায়, উদ্ধার করা গরু আদালতের মাধ্যমে ছাড়িয়ে নিতে হবে। তাই একটি লিখিত অভিযোগ দিতে হবে। এই কথা শুনে লিখিত অভিযোগ দেয় নুর উদ্দিন।’

গরু চুরি মামলার বাদী ও চার আসামির বাড়ি উপজেলার দরগাপাশা ইউনিয়নে। এই ইউনিয়ন পরিষদের সদ্য সাবেক চেয়ারম্যান মনির উদ্দিন বৃহস্পতিবার বলেন, ‘গরু আটকের পরপরই সেখান থেকে একজন ইউপি সদস্য আমারে কল দেন। আমি নুর উদ্দিনকে খবরটি জানাই এবং সেখানে যেতে বলি। এরপর জানতে পারি- এই ঘটনায় যাদের আটক ও মামলায় আসামি করা হয়েছে তারা সবাই আমার এলাকার। আসামিপক্ষের লোকজনও আমার কাছে এসে বিষয়টি আপসে নিষ্পত্তির অনুরোধ করেন।

‘তাদের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে আমি নুর উদ্দিনকে আপসের প্রস্তাব দেই। তাকে বলি, আসামিরা আর এই কাজ করবে না বলে কথা দিয়েছে। ক্ষতিপূরণও দেয়া হবে। আমার প্রস্তাবে রাজি হয়ে ওই রাতেই নুর উদ্দিন থানায়ও আপসের কথা জানান। এর পরিপ্রেক্ষিতে পরদিনই সব আসামি আদালতের মাধ্যমে জামিন পান।’

এরপর গ্রাম্য সালিশের মাধ্যমেও বিষয়টি আপসে নিষ্পত্তি হয়েছিল বলে জানান নুর উদ্দিনের মামলার সাক্ষী মতচ্ছির আলী। তিনি বলেন, ‘এই ঘটনার কিছুদিন পরই গ্রামে সালিশ বৈঠক বসে। ঠিক কবে সালিশ বসেছিল তা এখন মনে নেই। তবে মাসখাসেক আগে তো হবেই। সালিশে আমিও ছিলাম। ওই দিনই বিষয়টি শেষ হয়ে যায়।’

উজির মিয়া কেন গ্রেপ্তার

ঘটনা ঘটে শান্তিগঞ্জের দরগাপাশা ইউনিয়নে। গরুর মালিক ও আটক চারজন একই এলাকার। অথচ ৯ ফেব্রুয়ারি রাতে পাশের পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নের শত্রুমর্ধন গ্রামের উজির মিয়াকে আটক করে পুলিশ। কেন এই মামলায় উজিরকে আটক করা হয় সে জবাব নেই স্থানীয়দের কাছেও।

মামলার সাক্ষী মতচ্ছির আলী বলেন, ‘গরু উদ্ধার, মামলা, সালিশ বৈঠক- সবসময়ই আমি উপস্থিত ছিলাম। এই ঘটনায় উজির মিয়ার সম্পৃক্ততার কথা কেউ কখনও বলেননি। বাদীও তার নাম বলেননি। তবু তাকে কেন আটক করা হলো তা পুলিশই ভালো বলতে পারবে।’

আপসের পরও উজিরকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে বৃহস্পতিবার দক্ষিণ সুনামগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাজী মুক্তাদির হোসেন দাবি করেন, তিনি কিছু জানেন না। তিনি বলেন, ‘গরু চুরির মামলায় কোনো আপস হয়েছে কি না তা আমার নলেজে নেই। তখন আমি ছুটিতে ছিলাম। আর এই ঘটনায় এখন উচ্চপর্যায়ের তদন্ত চলছে। ফলে কোনো মন্তব্য করতে পারব না।’

আরসি-০৮