‘অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণেই ডুবছে হাওরের ফসল’

নিজস্ব প্রতিবেদক


এপ্রিল ০৭, ২০২২
০৩:৫০ অপরাহ্ন


আপডেট : এপ্রিল ০৭, ২০২২
০৩:৫০ অপরাহ্ন



‘অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণেই ডুবছে হাওরের ফসল’
সংবাদ সম্মেলনে হাওর বাঁচাও আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ

বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণেই ঢলে সুনামগঞ্জের কয়েকটি হাওরের বোরো ফসল তলিয়ে গেছে বলে অভিযোগ করেছেন নাগরিক সংগঠন ‘হাওর বাঁচাও আন্দোলন’ এর নেতারা। তাদের দাবি, যথাযথভাবে বাঁধের কাজ না হওয়ায় হুমকির মুখে পড়েছে আরও অন্তত ৩০টি হাওরের ফসল।

গতকাল বুধবার বিকেলে সিলেট নগরের একটি হোটেলে সংবাদ সম্মেলনে এমন অভিযোগ করেন সংগঠনের নেতারা। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন, সংগঠনের সুনামগঞ্জ জেলা কমিটির কার্যকরি সভাপতি ও ছাতক উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান অলিউর রহমান চৌধুরী বকুল।

২০০৭ সালের অকাল বন্যায় হাওরের ব্যাপক ফসলহানির পর ‘হাওর বাঁচাও আন্দোলন’ নামের এই নাগরিক সংগঠনটি গড়ে ওঠে। এবছরও অকাল বন্যায় বাঁধ ভেঙে কয়েকটি হাওরে পানি প্রবেশ করেছে। তলিয়ে কিছু টাঙ্গুয়াসহ একাধিক হাওরের শতাধিক হেক্টর ফসল। ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণে গাফিলতি ও অনিয়মের কারণেই হাওরে পানি ঢুকে ফসল তলিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে অলিউর রহমান চৌধুরী বকুল বলেন, ‘নির্ধারিত সময়ে ফসলরক্ষা বাঁধের কাজ শেষ না হওয়ায় গত ২ এপ্রিল বাঁধ ভেঙে তলিয়ে যায় তাহিরপুর উপজেলার টাঙ্গুয়ার হাওর। ৪ এপ্রিল শাল্লা, ছাতক ও সুনামগঞ্জের কয়েকটি হাওর এবং সর্বশেষ ৫ এপ্রিল বিকেলে ধর্মপাশা উপজেলার চন্দ্র সোনার তাল হাওর তলিয়ে যায়। এতে তলিয়ে গেছে এসব হাওরের বোরো ধান।’

অলিউর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘কার্যাদেশ অনুযায়ী ২০২১ সালের ১৫ ডিসেম্বর হাওরের ফসল রক্ষা বাধেঁর কাজ শুরু হয়ে চলতি বছরের ২৮ ফেব্রæয়ারি শেষ হওয়ার কথা ছিল। আজ পর্যন্ত কোনো বাধেঁর কাজই শতভাগ শেষ হয়নি। শতকোটি টাকার প্রকল্পে শুরু থেকেই মনিটরিং করা হয়নি।’

সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘নির্ধারিত সময়ে বাঁধের কাজ শেষ না হওয়ায় জেলার মাটিয়ান হাওর, শনির হাওর, দেখার হাওর, জামখলা হাওর, কাচিভাঙ্গা হাওর, সাংহাই হাওর, খাই হাওর, নান্দাইর হাওর, মাচুখালি হাওর, চাওলির হাওর, খরচার হাওর, আঙ্গুর আলীর হাওর, পুটিয়ার হাওর, হালির হাওরসহ ৩০টির অধিক হাওরে ফসল আজ হুমকির মুখে। এসব হাওরে বাঁধের কাজে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। এখনও বাঁধের কাজ শেষ হয়নি। ফলে বাঁধ ভেঙে যেকোনো সময় ফসল তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকরা।’

তার দাবি, গত ৩ এপ্রিল রাত থেকে এসব হাওরের কৃষকরা বাঁধের দায়িত্ব নিজেদের কাধে নিয়েছেন। স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে ফসল রক্ষায় দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন তারা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে সুনামগঞ্জের হাওরে এবার ২ লাখ ২২ হাজার ৬৯৫ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ করা হয়েছে। এ বছর জেলায় বোরো উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৩ লক্ষ মেট্রিক টন।

হাওর অধ্যুষিত সুনামগঞ্জের একমাত্র ফসল বোরো ধান। কারণ এ জেলার ছোট-বড় ৯২টি হাওর বছরের বেশিরভাগ সময়ই পানির নিচে থাকে। কেবল এই সময়ে বোরো চাষ করা হয়। তবে বৃষ্টি ও ঢলে নদীর পানি উপচে যাতে হাওরে প্রবেশ করতে না পারে সে জন্য প্রতিবছরই নির্মাণ করা হয় হাওররক্ষা বাঁধ।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের সুনামগঞ্জ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এ বছর ১২৪টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) মাধ্যমে ৪১টির বেশি হাওরে ৫৩২ দশমিক ৩৯ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১২৪ কোটি টাকা।

প্রতিটি পিআইসিতেই সভাপতি হিসেবে স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সদস্য সচিব হিসেবে রয়েছেন স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্মকর্তা। এই দুই কার্যালয়ের সংশ্লিস্টদের বিরুদ্ধেই বাঁধ নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।

এমন অভিযোগ তুলে হাওর বাঁচাও আন্দোলনের নেতা অলিউর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘কাজের শুরু থেকেই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় ও পানি উন্নয়ন বোর্ড কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন উপজেলায় পিআইসি গঠনে নয় ছয় করা হয়েছে। এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগও দায়ের করা হয়েছে। অভিযুক্ত পিআইসি সদস্যরা গা ঢাকা দিয়েছেন।’

সংবাদ সম্মেলনে অন্যন্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, হাওর বাঁচাও আন্দোলন সুনামগঞ্জ জেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, ছাতক হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি শমরুজ আলী প্রমুখ।

আরএম-০৪