গৃহবধূ থেকে প্রধানমন্ত্রী

সিলেট মিরর ডেস্ক


ডিসেম্বর ৩০, ২০২৫
১২:৪৫ অপরাহ্ন


আপডেট : ডিসেম্বর ৩০, ২০২৫
১২:৪৫ অপরাহ্ন



গৃহবধূ থেকে প্রধানমন্ত্রী


বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। ১৯৮১ সালের মে মাসে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা এবং রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে যখন হত্যা করা হয়, খালেদা জিয়া তখন নিতান্তই একজন গৃহবধূ। রাজনীতি নিয়ে চিন্তাধারা তো দূরের কথা, রাজনৈতিক কোনো অনুষ্ঠানেও তাঁকে খুব একটা দেখা যেত না। সময়ের পরিক্রমায় সেই তিনিই একজন গৃহবধূ থেকে অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে হয়েছেন তিনবারের প্রধানমন্ত্রী। ঘরে-বাইরে নানা ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে তাঁকে এই দীর্ঘ বন্ধুর পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। স্বামী হারানোর বেদনার মধ্যে তাঁর গড়া দলের হাল ধরতে হয়েছিল খালেদা জিয়াকে। সেখানেও অনেক প্রতিবন্ধকতায় পড়তে হয়েছে তাঁকে। সেখান থেকে শুরু হয় রাজনৈতিক সংগ্রামের জীবন। টানা আট বছর রাজপথে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। যখন তিনি এই আন্দোলনের পথে হাঁটতে শুরু করেন তখন শুরুতে কেউ পাশে না থাকলেও একসময় তিনি পুরো জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন। কখনো আপস করেননি বলে তাঁকে আপসহীন নেত্রী উপাধি দেওয়া হয় তখন। দৃঢ় মনোবলের কারণে, দেশপ্রেমের কারণে, গণতন্ত্রের প্রতি দায়বদ্ধতার কারণে দেশের আপাময় জনগণ তাঁকে কখনও ছেড়ে যায়নি। নব্বইয়ে স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের পতনের পর ভঙ্গুর দলকে নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেন এবং অকল্পনীয়ভাবে তাঁর দল জয়লাভ করে ক্ষমতায় আসে। খালেদা জিয়া তাঁর রাজনৈতিক জীবনে যতগুলো নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন, সবগুলোতেই বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছিলেন। দেশে এ রকম নজির আর কারও নেই। তিনি মুসলিম বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম লিখিয়েছেন। 


জন্ম ও বিয়ে

খালেদা জিয়া ১৯৪৫ সালে জন্ম গ্রহণ করেন। তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে ছিলেন তৃতীয়। ছোটবেলায় তাঁর ডাক নাম ছিল পুতুল। বাবা ইস্কান্দার মজুমদার ফেনীর বর্তমান পরশুরাম উপজেলার শ্রীপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ব্যবসায়ী ছিলেন। ব্যবসার উন্নতির জন্য তিনি দিনাজপুরে গিয়েছিলেন। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান একটি স্বাধীন দেশে পরিণত হলে তিনি দিনাজপুরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। ১৯৩৭ সালের ১৯ মার্চ তাঁর সঙ্গে তৈয়বার বিয়ে হয়। তৈয়বা বর্তমান পঞ্চগড় জেলার বোদা উপজেলার চন্দনবাড়ীর বাসিন্দা। এই পরিবার ‘টি-ফ্যামিলি’ নামে পরিচিত। তাঁর মা তৈয়বা মজুমদার সমাজকর্মী ছিলেন।


তরুণ ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা হিসেবে দিনাজপুরে কর্মরত থাকার সময় খালেদা খানমকে বিয়ে করেন। ১৯৬০ সালের ৫ আগস্ট শুক্রবার দিনাজপুরের মুদিপাড়ায় খালেদার বাবার বাড়িতে বিয়ের আয়োজন করা হয়। খালেদা জিয়ার শ্বশুর বিয়ের অনুষ্ঠানে থাকতে পারেননি, কারণ তিনি করাচিতে ছিলেন। বিয়ের বছর খানেক আগে জিয়ার মা মারা যাওয়ায় তিনি শাশুড়ির স্নেহ থেকেও বঞ্চিত হন। খালেদার মা ছিলেন জিয়ার মায়ের দূর সম্পর্কের আত্মীয়।


পূর্বের সংবাদ-

খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে সাত দিন শোক পালন করবে বিএনপি


খালেদা জিয়া ৩৬ বছর বয়সে বিধবা হওয়ার পর থেকেই জাতির সেবায় আত্মনিবেদন করেছেন। তিনি এমন একটি সময়ে স্বকীয় রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করেছেন, যখন পুরুষশাসিত সমাজের একচেটিয়া আধিপত্য ছিল। তিনি প্রথমে রাজনৈতিক ও পরে সরকারি গুরুদায়িত্ব সময়োচিতভাবে গ্রহণ করেছিলেন, যা ছিল সংকটপূর্ণ যুগসন্ধিক্ষণে ঐতিহাসিক চ্যালেঞ্জ। এমন এক সময়ে খালেদা জিয়া দলের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিলেন, যখন দেশ এরশাদের চাপানো সামরিক শাসনের জাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছিল। 


জিয়ার উত্তরসূরি সন্ধান ও খালেদা জিয়া 

১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারের নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত বিএনপি সরকারকে উৎখাত করেন এবং সামরিক আইন জারি করেন এইচ এম এরশাদ। নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক (সিএমএলএ) হিসেবে ঘোষণা করে প্রকারান্তরে রাষ্ট্রক্ষমতা কুক্ষিগত করেন তিনি। এরশাদের আগ্রাসী অবস্থান তাৎক্ষণিকভাবে বিএনপিকে দুর্বল করে দিয়েছিল। জিয়ার মৃত্যুর পর তাঁর প্রতিষ্ঠিত দলটি যেন উত্তাল সাগরে দিশাহারা হয়ে পড়েছিল। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বাড়ার পাশাপাশি দলীয় নেতৃত্বের প্রতি আস্থার সংকট প্রকট হয়ে উঠেছিল এবং নতুন বাস্তবতার পটভূমিতে দলের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছিল, বিশেষ করে জিয়ার কোনো যোগ্য রাজনৈতিক উত্তরসূরি ছাড়া দলকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া একান্তভাবেই দুঃসাধ্য হয়ে গিয়েছিল। সদস্যপদ ও সমর্থকদের সংখ্যা বিবেচনায় ১৯৮১ সালের মধ্যে বিএনপি দেশের সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী রাজনৈতিক দল হিসেবে আবির্ভূত হয়। সদস্যদের মধ্যে বহুমুখী মতাদর্শের কারণে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার মূলনীতির চেয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের এমন একজন নেতা প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল, যিনি জিয়ার সুযোগ্য রাজনৈতিক উত্তরসূরি হতে পারবেন এবং স্বাধীনভাবে স্বকীয় নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হবেন। এদিকে বয়োবৃদ্ধ অসুস্থ সাত্তার ধকল কাটিয়ে উঠে দলকে কাঙ্খিত পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে ব্যর্থ হওয়ায় নতুনভাবে উজ্জীবিত হওয়ার জন্য নির্ভরযোগ্য কোনো একজনকে নেতা হিসেবে খুঁজছিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল।

স্বাধীনতা যুদ্ধে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও চৌকশ সেনা কর্মকর্তার স্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়া সাধারণ বাংলাদেশি গৃহবধূর মতো পরিমিত জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন। তিনি দুই ছেলে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমানকে লালনপালন করতেই বেশিরভাগ সময় ব্যয় করেছিলেন। এমনকি যখন স্বামী ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হন, তখনও খালেদা জিয়া নিজেকে রাজনীতিতে বা রাষ্ট্রীয় বিষয়ে সম্পৃক্ত করেননি, যদিও ফার্স্ট লেডি হিসেবে প্রটোকল অনুযায়ী তাঁকে আনুষ্ঠানিকতা বজায় রাখতে হয়েছে। জিয়া ও বেগম জিয়ার দুই ছেলে থাকলেও কোনো মেয়ে নেই। তাঁর অন্য বোনেরও কোনো মেয়ে নেই। বেগম জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান ১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর এবং ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো ১৯৭০ সালের ১২ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন। দুই ছেলেরই মেয়ে আছে। তারেক রহমানের একটি মেয়ে আছে। তাঁর মেয়ে এখন যুক্তরাজ্যে আইন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেছেন। কোকোর লন্ডননিবাসী দুই মেয়ে আছে। তারাও সেখানে লেখাপড়া করছেন।


বিএনপিতে যোগদান ও নিজেকে আত্মপ্রকাশ

জিয়ার অনুসারী ও কর্মীদের কাছে খালেদা জিয়ার পরিচিতি খুব কম থাকলেও দলের নেতৃস্থানীয় সবার কাছে তিনি সুবিদিত ছিলেন এবং তারা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন, দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখার জন্য তিনিই হতে পারেন সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য কান্ডারি। বছরের পর বছর ধরে এই মূল্যায়ন সঠিক বলে প্রমাণিত হয়েছে এবং তাঁর নেতৃত্বে দলটি ভেতরের ও বাইরের সব বাধা-বিপত্তি ও ঘাত-প্রতিঘাত উতরে টিকে আছে। অনেক হিসাব-নিকাশ কষার পর খালেদা জিয়াকে শেষমেশ চূড়ান্তভাবে পছন্দ করা হয়। ১৯৮১ সালের ৩০ মে ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থ্যানে বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর তিনি দলের পরিত্রাতা হিসেবে ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি বিএনপিতে যোগ দেন এবং নিজেকে আত্মপ্রকাশ করেন। 

দলীয় নেতৃত্ব গ্রহণের পর খালেদা জিয়াকে পার্টিকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে এবং এরশাদের স্বৈরাচারী সরকারের কবল থেকে মুক্তির জন্য আপসহীন সংগ্রাম চালিয়ে যেতে কঠোর ও অত্যন্ত শ্রমসাধ্য কাজ করতে হয়েছিল। দলীয় নেতৃত্ব ও সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে ৩৫ বছরে তিনি কেবল গণতন্ত্র সুরক্ষার জন্যই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন না, বরং বিপুল ঝুঁকির মধ্যেও সোচ্চার ছিলেন আধিপত্যবাদী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে, যারা দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদাকে হুমকির মুখে ফেলেছিল। দলীয় আদর্শে নিবেদিতপ্রাণ খালেদা জিয়ার কথা বিবেচনা করে তাই বলা যায়, ‘খালেদা জিয়া’ ও ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল’ পারস্পরিকভাবে সমার্থক হয়ে উঠে।


এরশাদবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব

দলের মধ্যে একটি অংশের বাধার মধ্যেও খালেদা জিয়া ১৯৮৩ সালের মার্চ মাসে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হন। ওই বছরের ১ এপ্রিল দলের বর্ধিত সভায় তিনি জীবনের প্রথম বক্তৃতা করেন। বিচারপতি সাত্তার অসুস্থ হলে খালেদা জিয়া বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৮৪ সালের ১০ মে তিনি দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। বিএনপির সাংগঠনিক বিপর্যয়কর অবস্থার মধ্যেই দলের হাল ধরে ১৯৮৩ সালে তিনি ৭ দলীয় ঐক্যজোট গঠন করেন। শুরু করেন এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন। খালেদা জিয়া মূলত ১৯৮৩ সালের সেপ্টেম্বরে ৭ দলীয় ঐক্যজোটের মাধ্যমে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটান। ওই সময় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৫ দলের সাথে যৌথভাবে আন্দোলনের কর্মসূচি শুরু করেন। ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত পাঁচ দফা আন্দোলন চলতে থাকে। কিন্তু ১৯৮৬ সালের ২১ মার্চ রাতে আওয়ামী লীগ হঠাৎ করে এরশাদের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিলে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে ছেদ পড়ে। 


‘আপসহীন’ নেত্রীর খেতাব

নির্বাচন প্রশ্নে বিরোধে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৫ দল ভেঙে ৮ দল ও ৫ দলে ভাগ হয়। শেখ হাসিনার নের্তৃত্বে ৮ দল ও জামায়াত ৮৬ সালের নির্বাচনে যায়। এরপর খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ৭ দল, বাম দলগুলোর পাঁচ দলীয় ঐক্যজোট থাকে রাজপথে। ১৯৮৭ সাল থেকে খালেদা জিয়া ‘এরশাদ হটাও’ এক দফার আন্দোলন শুরু করেন। সংসদ ভেঙে দিতে বাধ্য হন এরশাদ। আওয়ামী লীগ সংসদ থেকে বের হয়ে এলে পুনরায় শুরু হয় ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন। রাজপথে দীর্ঘ ৮ বছর একটানা আপসহীন সংগ্রামে ১৯৯০ সালে ৬ ডিসেম্বর এরশাদ ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে এসে দেশবাসীর কাছে পেয়ে যান ‘আপসহীন’ নেত্রীর খেতাব।


বাংলাদেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী

১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনে বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলে খালেদা জিয়া হন বাংলাদেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী। তিনি স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটানোর জন্য আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন, জনগণকে দুঃশাসনের বিরুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন এবং গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়া ফিরিয়ে আনার জন্য নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তিনি এত অল্প সময়ের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও জনপ্রতিনিধিত্বশীল নেতায় পরিণত হবেন- এটি তাঁর বিরুদ্ধাচারীদের কাছেও অচিন্তনীয় ছিল। তাই ১৯৯১ সালের সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল দেখে তারা হতভম্ব হয়েছিলেন। 


হারেননি কখনও

তিনি যে কেবল আন্দোলনেই নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তা নয়, অভূতপূর্ব জনসমর্থন- পাঁচটি আসনে তাঁর বিজয়ও নিশ্চিত করেন। তারপর থেকে বিরুদ্ধাচারীদের শত ঘৃণ্য কৌশল সত্ত্বেও তিনি কোনো নির্বাচনে হেরে যাননি। যদি নির্বাচন জনপ্রিয়তার মান নির্ধারণ করে, তাহলে তিনি সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছেন। কখনও হেরে যাননি। বাংলাদেশে বা উপমহাদেশে তাঁর সমমর্যাদার অন্য কোনো রাজনৈতিক নেতা এ ধরনের কৃতিত্ব দেখাতে পারেননি।

স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন সংগঠিত করে খালেদা জিয়া তাঁর কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জনে সংকল্পবদ্ধ হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর কাছে এটা ছিল গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকারের প্রতি এক ধরনের আধ্যাত্মিক উপলব্ধি। এই প্রেক্ষাপটে তাঁর সামনে দুটি সমস্যা ছিল- এরশাদকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য সুসংহতভাবে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া এবং দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখা। এ সময়ে দলীয় ঐক্য একাধিকবার তীব্র আঘাতের সম্মুখীন হয়েছিল, কিন্তু তিনি শক্ত হাতে সেই প্রতিকূলতা মোকাবিলা করেছিলেন। তিনি রাজপথে আন্দোলন, নির্বাচনে জয়লাভ ও সরকার গঠনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। 


দুই প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই

১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত তিনি দুই ধরনের প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করেছিলেন- এর একটি ছিল দলের অভ্যন্তরীণ সমস্যা, যেমন আন্তঃকোন্দল এবং অন্যটি স্বৈরাচারী এরশাদ। তাঁর নেতৃত্বকালীন বছরগুলোতে তিনি দলের ওপর একক ও ফলপ্রসূ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি তিনটি বিষয়ে খুব জোর দিয়েছিলেন- জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ঐক্য ও রাজনীতি তৃণমূলের কাছে নিয়ে যাওয়া; প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়ার সম্মান ও মর্যাদা সমুন্নত রাখা এবং আওয়ামী লীগের প্রতি সম্যক দৃষ্টিভঙ্গি। 

নব্বইয়ের নির্বাচনে তিনি ক্ষমতায় এসে প্রেসিডেন্ট শাসিত সরকার ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবির আন্দোলনের মুখে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন করে সংবিধানের সংশোধনী এনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন এবং পদত্যাগ করেন। ওই বছরের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১১৬টি আসন পেয়ে জাতীয় সংসদের বিরোধী দলের নেত্রী হন। আর আওয়ামী লীগ ১৪৭ আসন পেয়ে জাতীয় পার্টি ও জাসদের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করে।


 ‘এক-এগারো’র পটপরিবর্তন ও ক্ষমতা হাতছাড়া 

২০০১ সালের ১ অক্টোবর অষ্টম সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। তবে অষ্টম সংসদের মেয়াদপূর্তির পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে বিরোধে রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে ‘এক-এগারো’ রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটে; তিনি ক্ষমতা থেকে ছিটকে পড়েন। এ সময় তাঁকে বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়। কিন্তু জুলুম-নির্যাতনের মুখেও তিনি দেশ ছেড়ে যাননি। ২০০৭ সালে ৩ সেপ্টেম্বর তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। এক বছর কারাগারে থাকার পর ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তিনি মুক্তিলাভ করেন। এর আগে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের ১৯৮৩ সালের ২৮ নভেম্বর, ১৯৮৪ সালের ৩ মে, ১৯৮৭ সালের ১১ নভেম্বর গ্রেপ্তার হন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি বিতর্কিত নির্বাচনের পরের বছর জনগণের ভোটের অধিকার আদায়ের আন্দোলন করতে গিয়ে গুলশানে দলীয় কার্যালয়ে একটানা ৯৩ দিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঘেরাওয়ে ছিলেন। পরের বছরও তাঁকে একইভাবে ঘেরাওয়ের মধ্যে থাকতে হয়েছিল।


নিঃসঙ্গ ও যোগাযোগহীন জীবনযাপনে বাধ্য 

৩৫ বছরের সক্রিয় রাজনৈতিক জীবনে খালেদা জিয়া সবসময় জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য সোচ্চার ও সংগ্রামমুখর ছিলেন। তাঁর প্রতিশ্রুতির জন্য তাঁকে ভুগতে হয়েছে। তাঁকে কারারুদ্ধ করা হয়েছিল, তাঁর সভা ও মোটর শোভাযাত্রা বিরোধীদের ভয়ঙ্কর আক্রমণের শিকার হয়েছিল। তাঁকে নিঃসঙ্গ ও যোগাযোগহীন জীবনযাপন করতে বাধ্য করা হয়েছিল। তিনি শুধু বাংলাদেশেই নয়, সম্ভবত বৈশ্বিক ক্ষেত্রেও একমাত্র রাজনীতিবিদ, যিনি ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ২৩ সংসদীয় আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন এবং কোনোটিতেই পরাজিত হননি।

২০১৮ সালের নির্বাচনেও খালেদা জিয়া তিনটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চেয়েছিলেন। এসব আসন হচ্ছে ফেনী-১. বগুড়া-৬ ও বগুড়া-৭। কিন্তু দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত হবার কারণে নির্বাচনে অযোগ্য হয়ে পড়েন। খালেদা জিয়ার অতীত নির্বাচনগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তিনি বগুড়া, ফেনী, লক্ষ্মীপুর ও চট্টগ্রামের আসন থেকে বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। এছাড়া ১৯৯১ সালে ঢাকার একটি আসন থেকে এবং ২০০১ সালে খুলনার একটি আসন থেকে ভোটে লড়েছেন। নির্বাচনের ফলাফল পর্যালোচনা করে দেখা যায়, শুধু জয়লাভই নয়, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের সাথে খালেদা জিয়ার ভোটের ব্যবধানও ছিল বেশি।


‘দেশনেত্রী’ সম্বোধন 

তিনি দেশের অদ্বিতীয় জননন্দিত নেতা। দেশের প্রায় সব জায়গায় তিনি গেছেন। তিনি শ্রমসাধ্য দীর্ঘ সফর করতে পারঙ্গম ছিলেন। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে জাতীয় নির্বাচনের ১৪ দিন আগে তিনি সারা দেশে প্রায় ১৪ হাজার কিলোমিটার ভ্রমণ করেছিলেন। যখন তিনি কোনো নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিতেন, তখন তিনি অদম্য প্রাণপ্রাচুর্যে বলীয়ান হয়ে উঠতেন। তখন তিনি সকাল, দুপুর বা রাতের খাবারের জন্য কোনো সময়সূচি বজায় রাখতেন না। তিনি রাত তিনটায় নির্বাচনী সভায় ভাষণ দিয়েছেন। তিনি তাঁর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ থাকতেন এবং একবার কোনো সিদ্ধান্ত নিলে কঠোরভাবে তা মেনে চলতেন। বিশ্বের ১০০ জন ক্ষমতাধর নারীর তালিকায় ফোর্বস ম্যাগাজিন খালেদা জিয়াকে ২০০৪ সালে ১৪তম, ২০০৫ সালে ২৯তম এবং ২০০৬ সালে ৩৩তম স্থান দেয়। ২০১১ সালের ২৪ মে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সি সিনেটে গণতন্ত্রের যোদ্ধা (ফাইটার ফর ডেমোক্রেসি) হিসেবে সম্মানিত হন। তাঁর দলীয় কর্মী ও সমর্থকরা তাঁকে অকপটে সম্বোধন করেন ‘দেশনেত্রী’ বলে।



এএফ/০৪