আবির হাসান-মানিক, তাহিরপুর
মে ১৭, ২০২০
০৮:২০ অপরাহ্ন
আপডেট : মে ১৭, ২০২০
০৮:২১ অপরাহ্ন
গত ১০ মে থেকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত পরিসরে দোকানপাট খোলার সিদ্ধান্তের পর শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে জনসমাগম না করে কেনাকাটা করার নির্দেশনা থাকলেও এর কোনো কিছুই মানা হচ্ছে না সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার হাট-বাজারগুলোতে। বিকেল ৪টা পর্যন্ত দোকানপাট খোলা রাখার কথা থাকলেও কেনাকাটা চলছে রাত অবধি! সব ধরনের দোকানপাট উন্মুক্ত রয়েছে। নির্দেশনা কার্যকর করতে প্রশাসনিক তৎপরতাও নেই আগের মতো। সবমিলিয়ে জনসাধারণের মাঝে করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হবার ঝুঁকি বেড়েছে।
তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ ৮০ জন সন্দেহভাজনের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হলে মোট ৮ জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়। নমুনা সংগ্রহের পরিমাণ বাড়ানো গেলে শনাক্তের সংখ্যাও বৃদ্ধি পাবে। কারণ তাহিরপুরে করোনা শনাক্তের যথেষ্ট কারণ আছে। এর মধ্যে অন্যতম কারণ হলো বহিরাগত জনস্রোত।
এতো কিছু আশঙ্কার মধ্যেই উপজেলার হাট-বাজারগুলোতে ঈদের আমেজ নিয়ে করোনা ভীতির কোনো তোয়াক্কা না করে ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে চলছে কেনাবেচা। এ যেন স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। নির্দেশনায় ১০টি শর্তে দোকানপাট খোলা রাখার কথা বলা হয়েছিল। এর মধ্যে অন্যতম হলো- ৫ জনের বেশি এক সাথে ভিড় করা যাবে না, ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়েরই মাস্ক ব্যবহার করবেন, দোকানের প্রবেশমুখে জীবাণুনাশক স্প্রে ছিটানো হবে। কিন্তু অধিকাংশ দোকানপাটগুলোতে এসব শর্তের কোনোটাই পরিলক্ষিত হচ্ছে না। আর ক্রেতা-বিক্রেতা কেউই এসব খুব একটা পাত্তা দিচ্ছেন না। ইজিবাইক, মোটরসাইকেল, রিকশাসহ অন্যান্য যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। লোকজন গাদাগাদি করে বসে এসব যানবাহন ব্যবহার করে বাজারে আসছেন।
সরেজমিনে উপজেলার প্রসিদ্ধ ব্যবসা কেন্দ্র বাদাঘাট বাজারের দোকানগুলোতে গিয়ে দেখা যায়, ঈদের আমেজে উপজেলার দূর-দূরান্ত থেকে এসে কেনাকাটা করার জন্য সকাল থেকেই দল বেঁধে ভিড় করছেন লোকজন। নারী-পুরুষ, স্কুল-কলেজ পড়ুয়া ছেলে-মেয়েরা, আবার অনেক অভিভাবকদের সাথে ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরাও এসেছে ঈদের কেনাকাটা করার জন্য। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, করোনাভাইরাসকে আমরা জয় করে ফেলেছি! এসব ভাইরাসের আর কোন অস্তিত্ব নেই! সবই কল্পকথা!
এতো জটলার ভিড়ে ছেলেমেয়েকে সাথে নিয়ে কেনাকাটা করছেন, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হবার ভয় নেই- বড়ছড়া থেকে প্রসিদ্ধ ব্যবসা কেন্দ্র বাদাঘাট বাজারে ঈদের কেনাকাটা করতে আসা কয়লা ও চুনাপাথর ব্যবসায়ী জয়নাল মিয়ার কাছে জানতে এমন প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, সামনে ঈদ। নতুন পোশাক কিনতে ছেলেমেয়েরা বায়না ধরল। তাদেরকে কোনোভাবেই বোঝানো গেলো না। শেষমেশ উপায়ন্তর না পেয়ে কেনাকাটা করতে বের হলাম অনেকটা বাধ্য হয়ে। আর ভয় তো কিছুটা আছেই। কিন্তু উপায় নেই বের না হয়ে।
মুখে মাস্ক নেই, শারীরিক দূরত্বও মানা হচ্ছে না। দেদারসে কেনাকাটা করে যাচ্ছেন। এতে করে নিজেকে করোনাভাইরাসে সংক্রমণের ঝুঁকিতে ঠেলে দেয়া হচ্ছে না? এমন এক প্রশ্নের উত্তরে কেনাকাটা করতে আসা শ্রীপুর (দক্ষিণ) ইউনিয়নের বাসিন্দা নুর আলী বলেন, বছর ঘুরে ঈদ আসে। তাই বাড়ির সবাই নতুন পোশাকের জন্য বার বার তাগিদ দিচ্ছে। নতুন কাপড় না কিনলে পরিবারের সদস্যদের মন রক্ষা করা যাবে না। তাই এতোসব কিছু না ভেবে কেনাকাটা করতে এলাম।
কেনাকাটায় ক্রেতা-বিক্রেতা কেউই স্বাস্থ্যবিধি মানছেন না। জটলা বেঁধে লোকজন ভিড় করছেন দোকানে। এ ব্যাপারে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক গার্মেন্টস ব্যবসায়ী জানান, দীর্ঘদিন দোকান বন্ধ থাকার পর কেনাবেচা করছি। পাওনাদার, দোকান ভাড়া, কর্মচারীদের বেতন, সংসার খরচ সব মিলিয়ে করোনা পরিস্থিতি মাথায় কাজ করছে না। কিভাবে অর্থনৈতিক মন্দা কাটাতে পারব সে চিন্তাই সারাক্ষণ মাথায় ঘোরপ্যাঁচ খাচ্ছে। আগে তো পেট বাঁচাই, তারপর করোনা!
শিক্ষক নিপু বলেন, এতো জনসমাগম এড়িয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে কেনাকাটা করা যাবে এমন কোনো উপায় নেই দোকানগুলোতে। লোকজন হুমড়ি খেয়ে, গাদাগাদি করে দোকানগুলোতে ভিড় করছেন। তাই সীমিত পরিসরে দোকানপাট খুলে দেয়াটা আমার মতে ঠিক হয়নি। কারন এতে করে আমাদেরকে সংক্রমিত হবার ঝুঁকিতে একধাপ এগিয়ে দেয়া হলো।
শুরুতে লকডাউন কার্যকর করতে প্রশাসনিক যে মনিটরিং ছিল তেমনটি আর দেখা মিলছে না। যে কারণে লোকজন হুমড়ি খেয়ে বাজারগুলোতে ভিড় করার সাহস পাচ্ছেন। যদি আগের ন্যায় পুলিশি টহল ও নির্দেশনা কার্যকর করতে প্রশাসনিক নজরদারি করা হয়, তাহলে এ জনস্রোত ঠেকানো যাবে। এমনই অভিমত স্থানীয়দের সচেতন মহলের।
এএইচ/আরআর