বিশ্বজিত রায়, জামালগঞ্জ
মে ১৯, ২০২০
০১:৫৭ অপরাহ্ন
আপডেট : মে ১৯, ২০২০
০৮:৪০ অপরাহ্ন
জামালগঞ্জে সরকারি গুদামে ধান দেওয়ার নামে কৃষকের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে একটি চক্র। কৃষকের নাম ভাঙ্গিয়ে ফায়দা লুটের চেষ্টা করছে ওই চক্র। এই চক্রের যুক্ত আছেন কয়েকজন জনপ্রতিনিধিও। এতে করে প্রকৃত কৃষকেরা বঞ্চিত হচ্ছেন। এ নিয়ে উপজেলার কৃষক ও সচেতন মহলে চরম অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, লটারির মাধ্যমে সবকিছু নির্ধারণ হয়েছে। এতে কোনো ধরনের অনিয়ম হয়নি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অনৈতিক সুবিধাভোগীরা নিজেদের প্রয়োজনে কৃষিকার্ড আছে কিন্তু জমি করেননি এমন অসংখ্য কৃষকের নাম কৌশলে তালিকাভূক্ত করিয়েছে। ধান বিক্রির তালিকায় আছে এদের অনেকের নাম। ফলে সরকারি গুদামে ধান দেওয়ার সামর্থ্য রাখে এমন কৃষকের নাম লটারিতে ওঠেনি বিধায় ধান দিতে পারছেন না কেউই। এছাড়া জমি চাষ করা সত্ত্বেও অনেকের কৃষিকার্ডই নেওয়া হয়নি। আবার কারও নাম নিলেও তা চতুরতার সাথে ছাঁটাই করা হয়েছে। এমন অভিযোগও পাওয়া গেছে।
১৭ মে সাচনা বাজার ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের চাঁনপুর গ্রামের কৃষক মানিক রঞ্জন তালুকদার ইউএনও বরাবরে অনিয়ম সংক্রান্ত একটি অভিযোগ দায়ের করেন। এতে তিনি বলেন, ‘আমি প্রায় ১৮ কেদার জমিতে ২১৬ মণ ধান পেয়েছি। সে ধান বিক্রির জন্য কৃষিকার্ড জমা দিলে কৃষি অফিসের প্রাথমিক তালিকায় আমার নাম অন্তর্ভুক্ত হয়। পরে অন্য কাউকে অনৈতিক সুবিধা দিতেই দায়িত্বপ্রাপ্তরা আমার নাম চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ দিয়ে দেন।’ এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।
এদিকে, ১০০ ও ১০১ নম্বর ক্রমিকে বেহেলী ইউপি চেয়ারম্যান অসীম তালুকদার ও তার সহোদর সসীম তালুকদারের নাম রয়েছে। এছাড়া লটারিপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নিজ গ্রাম মদনাকান্দিসহ পার্শ্ববর্তী গ্রামের অধিকাংশ কৃষকই তার আত্মীয়স্বজন কিংবা ঘনিষ্ঠজন। এদের নামে সুবিধাপ্রাপ্ত হবেন চেয়ারম্যান নিজেই এমন অভিযোগ উঠেছে।
জানা যায়, চেয়ারম্যানের সাথে যাদের সুসম্পর্ক নেই তাদের নাম ওঠেনি লটারিতে। মদনাকান্দি গ্রামের বড় কৃষক দেবাশীষ তালুকদার তাদের অন্যতম। তিনি বলেন, ‘লটারিতে যাদের নাম এসেছে তাদের অধিকাংশই চেয়ারম্যানের লোক। এই চার গ্রামের মধ্যে যদি কোনো বড় কৃষক থেকে থাকে তার মধ্যে আমি একজন। কিন্তু গতবারও ধান দিতে পারিনি। এইবারও আমিসহ আমরা তিন ভাইয়ের কোনো নামই নাই। লটারিতে যাদের নাম এসেছে তারা কেউই ধান দেবে না। তাদের নামে ফায়দা লুটবে চেয়ারম্যান নিজে। গত বছরও এমনটা হয়েছিল।’
এ ব্যাপারে বক্তব্য জানতে বেহেলী ইউপি চেয়ারম্যান অসীম তালুকদারকে বারবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
এ নিয়ে হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক অঞ্জন পুরকায়স্থ বলেন, ‘প্রকৃত কৃষিকার্ডে যারা ধান দিতে পারবে সেই কৃষকদের কাছ থেকে কার্ড সংগ্রহ করা হয়নি। যাদের ধান দেওয়ার ক্ষমতা নেই তাদের কার্ডই নেওয়া হয়েছে এবং তারাই লটারিপ্রাপ্ত হয়েছে। কিন্তু যারা ধান দিতে পারবে তাদের নাম নেই। এর মাঝখানে একটা শক্ত সিন্ডিকেট কাজ করছে। মিল মালিক, কৃষি অফিস ও জনপ্রতিনিধি এই তিনটা শক্তি মিলে সিন্ডিকেট পরিচালিত হচ্ছে।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ আজিজল হক বলেন, ‘লটারির মাধ্যমে কার নাম উঠে আর কার নাম উঠে নাই সেটা তো বলতে পারব না। লটারিতেই সব নির্ধারণ হয়েছে। এতে কারো হাত নেই।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও খাদ্যশস্য সংগ্রহ ও মনিটরিং কমিটির সভাপতি বিশ্বজিত দেব বলেন, ’যাচাই বাছাই কমিটির মাধ্যমে যেখানে আপত্তি ছিল সেটা বাদ দিয়ে আমরা উন্মুক্তভাবে লটারি করেছি। সেখানে কার নাম আসবে না আসবে সেটা তো লটারি দেখবে।’
প্রসঙ্গত, কৃষকের কাছ থেকে ২৬ টাকা কেজি দরে মণপ্রতি ১০৪০ টাকায় ধান ক্রয় করছে সরকার। এই কার্যক্রম চলবে আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত।
এনপি-১৫