আবির হাসান-মানিক, তাহিরপুর
মে ২০, ২০২০
০৯:২৯ অপরাহ্ন
আপডেট : মে ২০, ২০২০
০৯:২৯ অপরাহ্ন
ভারতের খাসিয়া জৈন্তিয়া নামক পাহাড় থেকে উৎপত্তি হওয়া যাদুকাটা নদী সুনামগঞ্জের তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর ও জামালগঞ্জ উপজেলা দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সুরমায় মিলিত হয়েছে। ৩২ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এ নদীর স্বচ্ছ জল আর পানির নিচে নুড়ি পাথর-বালির সংমিশ্রণ যে কাউকেই বিমোহিত করে। বর্ষায় টইটুম্বুর যাদুকাটা তার নিজস্ব রূপ-লাবণ্য নিয়ে হাজির হয়। সেই রূপের সঙ্গে নিজেকে বিলিয়ে দিতে পর্যটকরাও সেখানে হাজির হন।
অন্যদিকে যাদুকাটার বালু-পাথর উত্তোলন করে জীবিকা নির্বাহ করেন হাজারও মানুষ। বারকি নৌকা, হাজারও শ্রমিক আর পর্যটকদের পদচারণায় সারাবছর সরগরম থাকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি এ যাদুকাটা।
কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে এবার যাদুকাটা বড় নীরব, নিস্তব্ধ। নেই চিরচেনা কোলাহল, নেই শ্রমিকদের হাঁক-ডাক। করোনাভাইরাসের কারণে পর্যটক সমাগমে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, আছে বালু-পাথর উত্তোলনেও বিধি-নিষেধ। এতেই যাদুকাটার সকল কোলাহল থেমে গেছে। থেমে গেছে বালু-পাথর উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত প্রায় বিশ হাজার শ্রমিকের জীবনের চাকাও।
বর্তমান পরিস্থিতিতে যাদুকাটা নদীতে কাজ বন্ধ হয়ে পড়ায় হাজারও শ্রমিক পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকায় এসব শ্রমিকদের ঘরে দেখা দিয়েছে খাদ্য সংকট। তবে উপজেলা প্রশাসন বলছে, শ্রমিকদের কয়েক দফায় সাহায্য করা হয়েছে। এর বাইরেও বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া বিশেষ বরাদ্দের তালিকায়ও তাদের নাম রয়েছে। উপজেলা প্রশাসন সবসময় তাদের খোঁজ-খবর নিচ্ছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সুনসান-নিস্তব্ধ যাদুকাটার তীরে শত শত নৌকা ভিড়িয়ে রাখা হয়েছে। এ সময় ৩-৪ জন শ্রমিক নৌকায় বসে খাবার খাচ্ছিলেন। তারা জানালেন, গত ৪-৫ মাস ধরে যাদুকাটা নদীতে বালু-পাথর উত্তোলনের কাজ বন্ধ আছে। সবাই অনেক কষ্টে, খেয়ে-না খেয়ে দিনাতিপাত করছেন। সরকারি কোনো সাহায্য-সহযোগিতাও ঠিকমতো পাচ্ছেন না বলেও জানান তারা।
যাদুকাটা নদীতে কাজ করা জামবাগ গ্রামের আব্দুস সোবহান বলেন, চলমান লকডাউনে অনেকদিন যাবত নদীতে কাজ বন্ধ আছে। যে কারণে পরিবার নিয়ে বিপাকে পড়েছি। সরকারি সহায়তা যেটুকু পেয়েছি তাতে ৩-৪ দিন খেয়েছি। পরবর্তী সময়ে আর কোনো সহায়তা পাইনি। ৯ ছেলে-মেয়ে নিয়ে কিভাবে চলব এ নিয়ে ভাবতে গিয়ে কান্না আসে।
যাদুকাটায় বালু-পাথর উত্তোলনে শ্রমিক হিসেবে কাজ করা রাবেয়া আক্তার বলেন, ৫ ছেলে-মেয়ে নিয়ে গত ৩-৪ মাস ধরে অভাব-অনটনে দিন কাটাচ্ছি। স্বামী অসুস্থ অবস্থায় গত কয়েকমাস ধরে বিছানায় পড়ে আছেন। নিরুপায় হয়ে আমিই নদীতে কাজ করা শুরু করি কিন্তু হঠাৎ করে নদীতে কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আর কোনো কাজ করতে পারছি না। এখন ধার-দেনা করে টাকা এনে সংসার চালাতে হচ্ছে।
যাদুকাটা বালু-পাথর ব্যবসায়ী ও শ্রমিক সমবায় সমিতির সভাপতি আব্দুস শাহীদ বলেন, দেশের এ পরিস্থিতিতে নদীতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করা হাজারও শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। খেটে খাওয়া এসব শ্রমিক প্রথমদিকে সরকারি সহায়তা কিছুটা পেয়েছিলেন। কিন্তু তা দিয়ে তো মাসের পর মাস চলা সম্ভব না। নদীতে যদি কাজ বন্ধই থাকে, তবে খেটে খাওয়া এসব শ্রমিকদের জন্য দীর্ঘমেয়াদী রেশনিং ব্যবস্থা চালু করলে ভালো হতো। এতে অন্তত দু'মুঠো ভাত খেয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করতে পারতেন শ্রমিকরা।
পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজা বলেন, যাদুকাটা নদী বৃহত্তর এ অঞ্চলের খেটে খাওয়া মানুষের কর্মসংস্থানের অন্যতম উৎস। নদীতে কাজ বন্ধ থাকলে এলাকার অর্থনৈতিক ব্যবস্থার উপরও এর প্রভাব পড়ে। পরিবেশসম্মত উপায়ে যাদুকাটা নদীর মাঝখান থেকে শ্রমিকদের বালু-পাথর উত্তোলনের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহের সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
তবে তাহিরপুর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা বিজেন ব্যানার্জী বলেন, চলমান পরিস্থিতিতে যাদুকাটা নদীতে কাজ করা শ্রমিকসহ অন্যান্য কর্মহীন হয়ে পড়া লোকদের মাঝে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে তালিকা করে কয়েক দফায় খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর মানবিক সহায়তা থেকেও অনেক শ্রমিক ও কর্মহীন আর্থিক সহযোগিতা পাবেন। শ্রমিকরা এতদিন হাওরের ধান কাটার কাজেও নিয়োজিত ছিলেন।
চলমান পরিস্থিতিতে যাদুকাটা নদীতে শ্রমিকদের বালু-পাথর উত্তোলন বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসনের পরবর্তী নির্দেশনা ব্যতীত উপজেলা প্রশাসনের এককভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
এএইচ/আরআর-১৬