নাব্যতা সংকটে বিবর্ণ সুরমা

শুয়াইব হাসান


ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০২১
০১:২৯ অপরাহ্ন


আপডেট : ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০২১
০১:২৯ অপরাহ্ন



নাব্যতা সংকটে বিবর্ণ সুরমা
# স্থানে স্থানে চর # হাটু সমান পানি, নেই খননের উদ্যোগ

প্রায় দুইশ মিটার প্রস্থের সুরমা নদীর ১৮০ মিটারই বালুচর। ঘাসে পূর্ণ বালুচর দেখতে অনেকটা বড় মাঠের মতো। স্থানীয় কিশোরেরা নদীর চরে ফুটবল ও ক্রিকেট খেলছে। দেখে বুঝার উপায় নেই এটিই এক সময়ের স্রোতস্বিনী সুরমা। সিলেট নগরের কুশিঘাট এলাকায় সুরমা নদীর এই অবস্থা।

শুধু কুশিঘাট এলাকা নয়, সিলেট অঞ্চলের সব এলাকাতেই সুরমা নদীর অবস্থা প্রায় একই। চর জেগেছে অন্তত ৫০টি স্থানে। কোথাও কোথাও ক্ষীণ হয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। দিন দিন নদীর নাব্যতা কমলেও নদীটি খননের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না।

সিলেট শহরের পূর্ব প্রান্তে কুশিঘাট নামে দুটি মহল্লা। নগরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত সুরমা কুশিঘাটকে দুইভাগে ভাগ করেছে। দক্ষিণ কুশিঘাটের অবস্থান সিলেট সিটি করপোরেশনের ২৭ নম্বর ওয়ার্ডে। উত্তর কুশিঘাট ২৪ নম্বর ওয়ার্ডে। কুশিঘাট বাজারের পাশ দিয়ে ‘কুইখাল’ নামে একটি বড় খাল সুরমা নদীতে মিশেছে। ভরা মৌসুমে জৈন্তা, কানাইঘাটের বড় বড় হাওর ও গোলাপগঞ্জের একাংশের পানি এই খাল দিয়ে সুরমার জলে মিশে একাকার হয়।

ঠিক কুশিখালের মিলিত স্থল থেকে উজানে প্রায় আধা কিলোমিটার জায়গাজুড়ে বিশাল বালুচর। বালুচর নয়, এক ধরনের বাধ পড়েছে। বালুচরের উচ্চতা আরও ১০ থেকে ১২ ফুট বাড়লে ভরা মৌসুমে সুরমার স্রোত এখানেই থেমে যেতে পারে।

এদিকে, একইস্থানে সিলেট সিটি করপোরেশনের ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (পানি শোধনাগার প্রকল্প) থাকলেও পানি সংকটে তা অনেকটা বন্ধ রয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, গত ১০ থেকে ১২ বছর ধরে শুষ্ক মৌসুমে এখানে চর জাগে। ৫-৭ বছর ধরে চরের উচ্চতা বাড়লেও কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি পড়েনি। বরং, বর্ষায় অসাধু ব্যবসায়ীরা ড্রেজার মেশিনের মাধ্যমে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন করছেন। এ বিষয়েও প্রশাসনের কোনো উদ্যোগ লক্ষ্য করা যায়নি। এ অবস্থা কেবল কুশিঘাটে নয়; কানাইঘাটে সুরমার উৎসমুখ থেকে সুনামগঞ্জ পর্যন্ত দীর্ঘ এই নদীতে অন্তত ৫০টি জায়গায় চর জেগেছে। হাটুসমান পানিতে পায়ে হেটে নদী পারাপার হয়ে থাকেন স্থানীয়রা।

সরেজমিন ঘুরে এবং স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সিলেট নগরের পাশর্^বর্তী কালীঘাট, মাছিমপুর, ঝালোপাড়া, আখালিয়াঘাট, কুশিঘাট, মুক্তিরচক, কানিশাইলে বড় বড় চর জেগেছে। কানাইঘাটের লক্ষীপ্রাসাদ পূর্ব ইউনিয়ন, দক্ষিণ বাণীগ্রাম ইউনিয়নের বাউরভাগ, বাণীগ্রাম, ঝিংগাবাড়ী, তিনচটি, মুকিগঞ্জ, রাজাগঞ্জ এবং গোলাপগঞ্জের কয়েকটি স্থানেও দেখা গেছে অনুরূপ চর।

কানাইঘাট বাজার সংলগ্ন স্থানে সুরমা নদীতে বিশাল এলাকাজুড়ে চর জেগেছে। খেয়াঘাটে নৌকার বদলে হেটে পারাপার হচ্ছেন অনেকে। স্থানীয়রা জানান, প্রতিবছর শুষ্ক মৌসুমে খেয়াঘাট এলাকায় পানি কমতে থাকে। দুই দিকে পানি প্রবাহ কিছুটা থাকলেও পায়ে হেটে পাড়ি দেওয়া যায়। চলাচল করতে গেলে বালুচরে আটকা পড়ে নৌকা।

ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ফখরুল ইসলাম জানান, কানাইঘাট ছাড়াও উপজেলার বাণীগ্রাম, তিনচটি, মুকিগঞ্জ, তালবাড়ী ও রাজাগঞ্জ এলাকায় চর জেগেছে। এসব স্থানে পানি এতটাই কম যে প্রতিনিয়ত নৌকা চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়। মানুষ হেটে নদী পাড়ি দেয়।

এদিকে, নদীতীরবর্তী এলাকাগুলোতে আবাদি জমি থাকলেও পানির অভাবে ফসল ফলাতে পারছেন না কৃষকেরা। পানির অভাবে ফলন আশানুরূপ হচ্ছে না। নদীতীরের কৃষকেরা জানান, শুষ্ক মৌসুমে নদীতে পানি কমে যাওয়ায় নদীতীরবর্তী গ্রামের কৃষকেরা ধান ও সবজি চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন। আবাদি জমিগুলোও এখন অনাবাদি হয়ে পড়ছে। দশবছর আগে নদীর যে অংশে শুষ্ক মৌসুমে পানির উত্তাল প্রবাহ ছিল, এখন সেখানে যত দূর চোখ যায় কেবল ধু ধু বালুচর। গত কয়েক বছরে ধীরে ধীরে এই পরিবর্তন হলেও চার বছর ধরে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হয়েছে।

এ বিষয়ে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরো ও পরিবেশ প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক জহির বিন আলম বলেন, ‘জকিগঞ্জ উপজেলার অমলশিদ হয়ে সুরমার যে প্রবাহ সেখানেই বিশাল চর জাগায় পানির পুরো অংশই কুশিয়ারা নদীতে প্রবাহিত হচ্ছে। সুরমা নদীতে পানির প্রবাহ হ্রাস পাচ্ছে। এখন নদীটি কেবল ক্ষীণ একটি ধারায় প্রবাহিত হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সুরমা নদী এখন মূলত বিভিন্ন উপনদী থেকে পানি পাচ্ছে। উপনদীগুলোও দিন দিন অস্তিত্ব-সংকটে পড়ায় এ অবস্থা আরও খারাপ হচ্ছে। অথচ সুরমাকে ঘিরেই সিলেটের হাওরাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য গড়ে উঠেছে। সঙ্গত কারণেই নদীতে চর জাগায় হাওরের জীববৈচিত্র্যও সংকটে পড়ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সিলেট কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় বর্তমানে সুরমা নদীতে পানির প্রবাহ আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। নদীটি নাব্যতা হারিয়ে ফেললেও খননে কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেই।

সেভ দ্য হ্যারিটেজ এর প্রতিষ্ঠাতা, গবেষক আব্দুল হাই আল হাদী বলেন, ‘দুটি কারণে সুরমা মৃতপ্রায় হয়ে যাচ্ছে। এর একটি হচ্ছে, সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাব এবং অপরটি শাখা নদী ও খাল বিলের রক্ষণাবেক্ষণ না করা।’

তিনি আরও বলেন, ‘সুরমা দেশের প্রধান নদীগুলোর একটি। কিন্তু, শাখা নদীগুলো যেভাবে ধ্বংস হচ্ছে তাতে শুষ্ক মৌসুমে পানি সংকটে পড়ছে সুরমা নদী।’ নদীটি পরিকল্পিতভাবে খননের মাধ্যমে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্টদের উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

সমাজ অনুশীলন সিলেটের সদস্য সচিব মুক্তাদীর আহমদ মুক্তা সিলেট মিররকে বলেন, ‘সুরমায় একসময় জাহাজ, বড় বড় স্টিমার চলতো। সেই নদীপথগুলোতে এখন বড় নৌকাও চলতে পারে না। নদীমাতৃক বাংলাদেশে শুধুমাত্র রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নদীর গতিপথ নষ্ট হচ্ছে, নাব্যতা হারাচ্ছে নদীগুলো।’

তিনি বলেন, ‘পলি পড়ার কারণে নদীগুলো প্রবাহ হারিয়ে ফেলেছে। এ কারণে প্রাক মৌসুমি বন্যার প্রবণতা বৃদ্ধি, নদীর নাব্যতা হ্রাস এবং কৃষি ও জনবসতি ভাঙ্গনের সম্মুখিন হচ্ছে।’

নদীগুলোতে পরিকল্পিত ও বড়ধরনের ড্রেজিংয়ের (খনন) দাবি জানিয়ে মুক্তা আরও বলেন, ‘নির্দিষ্ট এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে দুই একটি খাল খনন করলেই বন্যা সমস্যার সমাধান হবে না। নদীগুলোর গতিপথ অনুযায়ী নদী শাসন নিশ্চিত করে বাস্তবসম্মত প্রকল্প গ্রহণ জরুরি।’

পানি উন্নয়ন বোর্ড সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ শহীদুজ্জামান সরকার জানান, আপাতত সুরমা নদী খননের কোনো প্রকল্প তাদের নেই। শুষ্ক মৌসুমে নদীগুলোতে নাব্যতা সংকটের বিষয়টি তারা পর্যবেক্ষণ করছেন। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় বিষয়টি দেখছে।

আরসি-১২