হাকালুকির ইসিএ এলাকার ২০ হাজার বৃক্ষ নিধন

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি


জুন ২০, ২০২১
১১:১১ অপরাহ্ন


আপডেট : জুন ২১, ২০২১
১১:১০ অপরাহ্ন



হাকালুকির ইসিএ এলাকার ২০ হাজার বৃক্ষ নিধন

হাকালুকি হাওরের প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকার (ইসিএ) মালাম বিলের পাড়ের হিজল-করচসহ বিভিন্ন প্রজাতির আনুমানিক ২০ হাজার গাছ কেটে ফেলার অভিযোগ পাওয়া গেছে। গাছগুলো পরিবেশ অধিদপ্তরের অর্থায়নে সৃজিত এবং প্রাকৃতিকভাবে জন্মেছে।

অভিযোগ উঠেছে, মালাম বিলের বাঁধ নির্মাণের নামে প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় ইজারাদারের লোকজন গাছগুলো কেটে নিয়েছে। এতে হুমকির মুখে পড়েছে হাকালুকি হাওরের জীববৈচিত্র্য। ওই বিলটি মৌলভীবাজারের বড়লেখা অংশে পড়েছে। 

এ ঘটনায় সম্প্রতি হাকালুকি ইসিএ ব্যবস্থাপনা বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সদস্য ও জলজ বনের পাহারাদার মো. আব্দুল মনাফ সাতজনের বিরুদ্ধে বড়লেখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।

অভিযোগের অনুলিপি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী, পরিবেশ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসককে দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে, এ ঘটনায় রহস্যজনক কারণে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে এখনও কোনো আইনি পদক্ষেপ নেননি সংশ্লিষ্টরা। এতে হাওর পাড়ের মানুষ ও পরিবেশবাদীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

তবে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বিষয়টি তদন্ত করে তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।   

অভিযোগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, হাকালুকি হাওরের অর্ন্তভূক্ত বড়লেখা উপজেলার অধীনে মালাম বিলের (মৎস্য জলাশয়) আয়তন ৪২৮ দশমিক ৯২ একর। ২০২০ সাল থেকে পাঁচ বছরের জন্য ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে ২১ লাখ ৩৭ হাজার ৩৪৩ টাকায় মালাম বিলটি ইজারা নিয়েছে বড়লেখা উপজেলার মনাদি মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি। পরিবেশ অধিদপ্তর ২০০৩ সাল থেকে বিভিন্ন প্রকল্পের অর্থায়নে কয়েক কোটি টাকা ব্যায় প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকার (ইসিএ) মালাম বিলের (কান্দির) পাড়ে সরকারি ভূমিতে হিজল, করচ, বরুনসহ বিভিন্ন প্রজাতির জলজ বৃক্ষ রোপণ করে। এ ছাড়া প্রাকৃতিকভাবে সেখানে বিভিন্ন প্রজাতির জলজ উদ্ভিদ বেড়ে ওঠে। বর্তমানে প্রাকৃতিক ও পরিবেশ অধিদপ্তরের সৃজিত জলজ উদ্ভিদগুলো ১০-১৫ ফুট উচ্চতার হয়েছে। যা হাকালুকি হাওরের ইসিএ এলাকার জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবরোধে বিশেষ অবদান রাখছে।

অভিযোগে বলা হয়, গত ২৭ মে প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় ইজারাদারের লোকজন বিলের বাঁধ নির্মাণের নামে বিলের পাড়সহ প্রায় ১২ বিঘা জমির প্রায় ২০ হাজার গাছ অবৈধভাবে কেটে নেয়। এরপর তারা সেখানে ট্রাক্টর দিয়ে জমি চাষ করে গাছগুলো মাটির মধ্যে মিশিয়ে দেয়।

হাকালুকি হাওরের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণকর্মী (বনায়ন পাহারাদার) আব্দুল মনাফ ও আরফান আলী বলেন ‘মালাম বিলের ইজারাদার সমিতির লোকজন বর্ণি ইউনিয়নের কাজিরবন্দ গ্রামের জয়নাল উদ্দিন, মক্তদির আলী, মশাইদ আলী, রিয়াজ উদ্দিন, কালা মিয়া, সুরুজ আলী, মনাদি গ্রামের জয়নাল উদ্দিন প্রমুখদের নিয়ে এক্সাভেটর দিয়ে মে মাসের প্রথম দিকে বিলের দক্ষিণ ও পূর্ব পাশের সরকারি ভূমির জলজ বৃক্ষ নিধন করে বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু করেন। আমরা বাধা দিলে তারা তা মানেনি। এ ছাড়া বিলের পাড়ের গাছ কেটে অনেকেই বোরো চাষের জমি তৈরি করছে। এ ঘটনায় সাতজনের নামে ইউএনওর কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি।’

মনাদি মৎস্যজীবী সমিতির পরিচালক জয়নাল উদ্দিন বলেন, ‘জলমহাল ইজারায় শুধু মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির নাম ব্যবহার করা হয়। সবাই জানেন এতে প্রভাবশালীরা বিনিয়োগ করেন। বিনিয়োগকারীরাই এখানকার গাছ কেটেছেন, বাঁধ দিয়েছেন। যদিও কাজটা মোটেও ঠিক হয়নি। বিষয়টি প্রশাসনের সঙ্গে মিটমাট করা হবে বলে শুনেছি।’

কারা গাছ কেটেছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি কোনো উত্তর দেননি।

বন বিভাগের হাকালুকি বিটের দায়িত্বে থাকা জুনিয়র ওয়াইল্ড লাইফ স্কাউট তপন চন্দ্র দেবনাথ বলেন, ‘জলা বনের পাহারাদারের মাধ্যমে খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। বনায়নটি পরিবেশ অধিদপ্তরের একটি প্রকল্পের। তাই বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে মৌখিকভাবে অবগত করেছি। বিষয়টি তাদের দেখার কথা।’

পরিবেশ অধিপ্তরের বাস্তবায়নাধীন ইবিএ প্রজেক্টের অ্যাডমিন অ্যান্ড ফাইনান্স অফিসার (এএফও) সাহিদ আল শাহিন বলেন, ‘হিজল-করচ গাছ কাটার ঘটনাটি পাহারাদার আমাকে জানিয়েছে। অফিসের কাজে আমি তখন ঢাকায় ছিলাম। তারা জানায় দুষ্কৃতিকারীরা প্রায় ২০ হাজার গাছ কেটে ফেলেছে। আমাদের প্রকল্পের মাধ্যমে ইসিএভুক্ত মালাম বিল এলাকায় প্রায় ৭০ একর জায়গায় হিজল-করচসহ পরিবেশবান্ধব গাছ লাগানো হয়েছিল। গাছগুলো অনেক বড় হয়েছিল। এ ঘটনায় পাহারাদার থানায় ও ইউএনওর কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। ইসিএভুক্ত এলাকায় সরকারি অনুমোদিত প্রকল্প ছাড়া গাছ কাটা, খনন, স্থাপনা নির্মাণ, পাখি শিকার করা ইত্যাদি বেআইনি। গাছগুলো কাটায় হাওরের পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।’

পরিবেশ অধিদপ্তর মৌলভীবাজারের সহকারি পরিচালক মো. বদরুল হুদা বলেন, ‘গাছ কাটার বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা হয়েছে।  জায়গাটি পরিদর্শন করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। এভাবে কোটি কোটি টাকার বন ধ্বংস করা ঠিক হয়নি’।

এ ব্যাপারে বড়লেখা উপজেলা নির্বাহী অফিসার খন্দকার মুদাচ্ছির বিন আলী রবিবার (২০ জুন) বিকেলে বলেন, ‘গাছ কাটার ঘটনাটি আমার যোগদানের আগেই ঘটেছে। এ বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। কে বা কারা গাছগুলো কেটেছে তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’  

প্রাণ ও প্রতিবেশবিষয়ক গবেষক পাভেল পার্থ জানান, দুনিয়ার সবচে বড় হাওরের ২০ হাজার হিজল, করচ, বরুণ গাছ কেটে ফেলা ভয়ংকর পরিবেশ সংকট তৈরি করবে। এতে মালাম বিলের জলজ বাস্তুতন্ত্র ও খাদ্য শৃংখলা বিনষ্ট হবে। হিজল, করচ, বরুণ গাছ হাওরের মাছ, পাখি ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল। হাওরবাসীর আশ্রয়স্থল এ গাছ। মাছের খাদ্য তৈরি হয় হিজল গাছে। পবিত্র গাছ হিসেবে এসব গাছের নিচে গড়ে ওঠে হিজলবাগ, করচবাগ। এসব গাছ হাওরে ধানের আবাদকেও সহায়তা করে। অনেক ওষুধি ব্যবহার আছে এসব জলাবৃক্ষের। একটি ইসিএ এলাকার এত গাছ কেটে ফেলা হলো হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ড, বনবিভাগ, প্রশাসন কী করল? এক দিনে তো এত গাছ কাটা সম্ভব নয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যেখানে সুন্দরবন বাড়ানোর উদোগ নিয়েছেন, সেখানে দেশের সবচেয়ে বড় হাওরের গাছ কেটে ফেলা অন্যায়। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। যত দ্রুত পারা যায় মালাম বিলে আবার হিজল, করচ, বরুণ লাগানো ও সংরক্ষনে স্থানীয় মানুষদের যুক্ত করতে হবে।

বিএ-১৬