@Framework : Laravel 6 (IT Factory Admin) @Developer : Faysal Younus Daily Sylhet Mirror | হাওরে গো-খাদ্যের সংকট, পানির দামে গরু বিক্রি
হাওরে গো-খাদ্যের সংকট, পানির দামে গরু বিক্রি

বিশ্বজিত রায়, হাওর থেকে ফিরে


মে ১৪, ২০২২
০৭:১৩ অপরাহ্ন


আপডেট : মে ১৪, ২০২২
০৭:১৩ অপরাহ্ন



হাওরে গো-খাদ্যের সংকট, পানির দামে গরু বিক্রি
হতাশ শতাধিক কৃষক পরিবার

শুষ্ক মৌসুমে এভাবে কাঁচা ঘাস খেয়ে বেঁচে থাকে গরু-বাছুর। ঘরে গো-খাদ্য (খড়) না থাকায় এ বছর প্রায় সব গরুই বেচে দিচ্ছে কৃষক পরিবারগুলো। ছবিটি হেমন্ত মৌসুমে হালি হাওর পাড়ের সুন্দরপুরের কান্দা থেকে তোলা।

‘ধান তো গেছেই, গরু পালাডাও এখন অসম্ভব। যারার খেড়-কুডার বেশি ক্ষতি হইছে তারাই হস্তায় গরু বেচতাছে। আমিও তো ছয়ডা গরু বেচছি। আমি যে গরুডি বেচতাছি, এই গরুডি তো আমার বেচার মতো আছিল না। খেড় না থাকায় বাধ্য হইয়া পঞ্চাশ হাজার টেকার গরু ত্রিশ-পাঁইত্রিশ হাজার টেকায় বেচন লাগতাছে। আমরার গ্রামের অনেকেই এইরকম গরু বেচতাছে।’ জামালগঞ্জের বেহেলী ইউনিয়নের আছানপুর গ্রামের হালি হাওর পাড়ের কৃষক মো. আমিনুল হক এ কথাগুলো বলেন।

গো-খাদ্যের সঙ্কটে পানির দামে গরু বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন জামালগঞ্জের হালি হাওর পাড়ের অধিকাংশ কৃষক। গত ২৪ এপ্রিল রাতে বাঁধ ভেঙ্গে হালি হাওরের নি¤œাংশ তলিয়ে গেলে তৎসংলগ্ন কয়েকটি গ্রামের খলায় স্তুপ করা ধান ও খড়ের গাদা পানিতে ভেসে যায়। এর সঙ্গে তলিয়ে যায় হালি হাওরের উত্তর-পশ্চিম অংশের কাটার বাকি প্রায় ৩০ ভাগ পাকা-আধাপাক ধান। হালি হাওর পাড়ের কৃষকেরা গৃহপালিত পশুর খাবার উপযোগী প্রয়োজনীয় খড় ঘরে তুলতে পারেননি। চোখের সামনে সোনালি ফসন তলিয়ে যাওয়ার কষ্ট কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই কৃষকেরা গো-খাদ্যের সঙ্কটে প্রায় দিশেহারা হয়ে নিজেদের গোয়ালভরা গরু নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করে দিচ্ছেন। আবার অনেকে গরু বিক্রি করতে পাইকারের খোঁজ করছেন। এতে হাওর পাড়ের কৃষকের মাঝে চরম অস্বস্তি কাজ করছে বলে জানা গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হাওর পাড়ের প্রায় সব বাড়িতেই কম-বেশি গরু আছে। এ বছর হাওরডুবির ঘটনায় কৃষকের মাথায় গরু নিয়ে বাড়তি যন্ত্রণা চেপে বসেছে। ২০১৭ সালের হাওর বিপর্যয়ের পর এ বছর হালি হাওরের উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিম অংশের মাহমুদপুর, হরিনাকান্দি, পৈন্ডুব, দুর্গাপুর, মদনাকান্দি, সহদেবপুর, আছানপুর, হরিপুর, উলুকান্দি, যতীন্দ্রপুরসহ বেশ কয়েকটি গ্রামের শতাধিক কৃষক পরিবার অন্তত পাঁচ শতাধিক গরুবাছুর বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়েছেন বলে জানা গেছে। এর মাঝে আরও অনেকে গরু বিক্রি করতে পাইকারদের পিছু নিয়েছেন।

বাঁধ ভেঙ্গে হাওর তলিয়ে যাওয়ায় অনেকে এক খড়ও ঘরে তুলতে পারেননি। এদের কারও হাওরে স্তুপ করে রাখা খড় পানিতে ভেসে গেছে, কেউবা অবশিষ্ট জমি তলিয়ে যাওয়ায় প্রয়োজনীয় খড় পাননি। এর মাঝে কেউ কেউ আগেভাগে কিছু খড় ঘরে তুলতে পারলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়। এমন অদ্ভ‚ত পরিস্থিতিতে গো-খাদ্যের সঙ্কট দেখা দেওয়ায় অনেকে গোয়াল খালি করে গরু বিক্রি করে দিচ্ছেন। কেউ গোয়ালের অর্ধেক গরু বিক্রি করেছেন, আবার কেউ সব বিক্রি করে দিয়েছেন। হাওর পাড়ে খোঁজ নিতে গেলে কৃষকেরা অস্বস্তির সুরে এমনটাই জানিয়েছেন।

বাঁধ ভেঙ্গে যাওয়ার পরদিন (২৫ এপ্রিল) হালি হাওর ঘুরে দেখা গেছে, হাওরে পানি চলে আসায় কৃষক-কৃষাণীদের মাঝে তাড়াহুড়ো ও চরম ব্যস্ততা কাজ করছে। হাওরের অবশিষ্ট ধান কাটা বাদ দিয়ে সবাই খলায় জাগ করা ধান একটু উঁচু জায়গায় তুলতে হন্যে হয়ে ছুটেছেন। তখন খলার আধা শুকনো ধান তুলতে গিয়ে কৃষক-কৃষাণীদের খড়ের দিকে তেমন নজর ছিল না বলেই মনে হয়েছে। এতে করে প্রায় বেশির ভাগ কৃষকের খড় পানিতে ডুবে গেছে। এ সময় কৃষকেরা কোনোরকম খানি-খোরাকের ধান তুলতে পারলেও গো-খাদ্যের উপযোগী খড় তারা ঘরে তুলতে পারেননি। তলানো হাওরের অনেক জায়গায় ডুবোকৃত খড়ের গাদার উপরাংশের মাথাটুকু ভেসে থাকতেও দেখা গেছে।

মামুদপুর গ্রামের কৃষক ও সাবেক ইউপি সদস্য মো. মসিউর রহমান বলেন, হাওর ডুবার কারণে জমি তল হইছে, শুকনা খেড়ও নষ্ট হইছে। যার কারণে ৫ টা গরু বিক্রি করছি আর বাকি ৫-৬টা আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে দিছি। খেড়ের অভাবে গ্রামের প্রায় সবাই গরু বিক্রি কইরা দিতাছে।

গরু কিনতে আসা পাইকার মো. উজ্জ্বল হোসেন জানিয়েছেন, খড়ের অভাব ও ঋণের তাগিদে গৃহস্থরা গরু বিক্রি করে দিচ্ছেন। এ মুহূর্তে তিনি আছানপুর থেকে ১২-১৩টি গরু কিনেছেন। এখন হরিপুরের উদ্দেশে রওয়ানা দিবেন। মামুদপুর, দুর্গাপুর ও মদনাকান্দি থেকেও ৫০-৬০টি গরু কিনেছেন। সবকিছু মিলে প্রায় ১৫০টি গরু কিনেছেন তিনি। আরও পাইকাররা আছে, তারাও গরু কিনে নিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন ওই পাইকার।

এ ব্যাপারে সুনামগঞ্জ জেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, গো-খাদ্যের সঙ্কটে পড়া কৃষকদের ব্যাপারে কোনো প্রণোদনার ব্যবস্থা নেই। তবে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তারা কি কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেটা নির্ধারণ করে তালিকা প্রস্তুত করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে। কর্তৃপক্ষ কোনো সিদ্ধান্ত জানালে সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।