মামুন পারভেজ
ফেব্রুয়ারি ০২, ২০২৬
১১:৩৬ অপরাহ্ন
আপডেট : ফেব্রুয়ারি ০২, ২০২৬
১১:৩৬ অপরাহ্ন
ক্ষীতিশ দাশের হাতে বোলবাণী
ছিল হাওরের খোলা হাওয়া/
আর কী পাবো সে চরণধুলি,
পরাণ সখা গেছে মথুরা চলি!
তবলার বোলবাণী তাঁর হাওরের খোলা বাতাসের মতো, নদীর বাঁকের মতো। প্রাচীন লোকগানে খোলা হাতের বাদন শৈলি ছিল অনবদ্য। গানের বাঁকে বাঁকে ছন্দের পরিবর্তন; ভিন্ন চালের বাদন আর দাপুটে চাটি। এই বয়োবৃদ্ধ বয়সে যেন যৌবন ফিরে পেতেন গানে বসলে। যাত্রার আখরাই বাদন, হোরি গানে ‘ছাইলে’ ঢোলকে চলা তুফান সবই ছিল দেখার মতো দৃশ্য!
তবলাশিল্পী ক্ষীতিশ চন্দ্র দাশ। আমাদের ক্ষীতিশ মামা চলে গেলেন না ফেরার দেশে। সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রিয় বোন, গুরুজি পণ্ডিত রামকানাই দাশের নাতনী সুকন্যা শৈলির ক্ষুদেবার্তা পেলাম, ‘ক্ষীতিশ মামা আর নেই!’ এইটুকুই সে লিখতে পেরেছে। এই সংবাদ যেন দিনের ঝলমলে আকাশটাকে মেঘাচ্ছন্ন করে দিল।
গুরুজির সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের দিন থেকে ক্ষীতিশ মামার সঙ্গে পরিচয়। সহজে আপন করে নেওয়ার আশ্চর্য এক ক্ষমতা ছিল তাঁর। অবাক হয়ে দেখতাম শিল্পী ক্ষীতিশ চন্দ্র দাশের সহজিয়া জীবন। সহজ, সরল আর বিনয়ী এই মানুষটির কাছে আমাদের ছিল যত আবদার ও দুষ্টুমি। গুরুজির সামনে নড়াচড়া করার সাহস কারো ছিল না। ক্লাসের বাইরে যত কথা সব ক্ষীতিশ মামার সঙ্গেই হতো। আমরা বিরক্ত করলেও তিনি কখনো বিরক্ত হতেন না। যতবার গেছি গুরুজির বাসায় একটা আদর আর মায়া মাখা কন্ঠ আমাদের স্বাগত জানাতো, ‘ভাগনা আইছ বও, বাজাও, রিয়াজ (রেওয়াজ) করো৷’
![]()
গুরুজির সঙ্গে আজন্ম ছিলেন তিনি। প্রায় তিন দশকের এই পথচলা। গুরুজি চলে যাবার পর, প্রায়ই আপন মনে শুধু বিলাপ করতেন হঠাৎ বলে উঠতেন ‘আহ! গুরুজি…’ কি দরদ আর আন্তরিকতার মিশেল ছিল এই ডাকে। অনন্ত অসীম অমৃতালোকে পণ্ডিত রামকানাই দাশ চলে যাবার পর পরিবার-শিক্ষার্থীদের মতো তিনিও মুষড়ে পড়েন। তখন গুরুজির বাসায় গানের আড্ডা এবং তালিম শুরু করেন গুরুজির তনয়া বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী কাবেরী দাশ। গানের তালিমের পাশাপাশি সেই আসর ঘিরে চলতো নানারকম আনন্দ উল্লাসের ফন্দি ফিকির। এই আসরের প্রধান আকর্ষণ ছিলেন প্রয়াত লোকসংগীত শিল্পী সুষমা দাশ ও তবলাশিল্পী ক্ষীতিশ চন্দ্র দাশ। তাদের ঘিরেই আমাদের গানআড্ডা জমে উঠতো। গানের বাণী আর সুর নিয়ে চলতো ময়না তদন্ত। সুষমা পীসির চুল ছেঁড়া বিশ্লেষণ। ক্ষীতিশ মামা কখনো তবলা, কখনো শ্রী খোল, কখনো ঢোলকে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন তাঁর প্রায় আশি বছর বয়সী হাত। আবার সুরে দোহার দিচ্ছেন। তীক্ষ্ণ হলেও সুরটি ছাপিয়ে যাচ্ছে সবার উপরে। ভুল হলে রেগে গিয়ে ধমকও দিচ্ছেন। আহা কী মধুর স্মৃতি!
মামার জন্য ডাবরি (ডার্বি) সিগারেট নিলেই হলো। এতেই মহাখুশি তিনি। খাবারের ব্যাপারে ছিলেন খুবই রসিক আর রুচিশীল। মিষ্টি আর খাসির মাংস ‘আধশের কোনো বিষয়ই না’, গল্পটা খুবই প্রচলিত ছিল আমাদের মধ্যে। দাঁত না থাকায় মন মতো খেতে না পেরে খাবার খাওয়ার মধ্যেই বিরক্তি নিয়ে বলে উঠতেন, ‘ভাগনা খাওন যায় না’। নিমন্ত্রণ খেতে গিয়েও এমনটা বলে ফেলতেন মাঝেমধ্যে। যাঁরা জানতেন না তাঁরা হয়তো ভাবতেন, রান্না ভালো হয়নি তাই এমন মন্তব্য। আসলে বিষয়টা এমন না, রান্না ঠিকই ভালো হয়েছে, কিন্তু উনি খেতে পারছেন না- তাই এমন মন্তব্য। অনেককেই বুঝিয়ে বলতে হতো সে কথা।
তবলার বোলবাণী তাঁর হাওরের খোলা বাতাসের মতো, নদীর বাঁকের মতো। প্রাচীন লোকগানে খোলা হাতের বাদন শৈলি ছিল অনবদ্য। গানের বাঁকে বাঁকে ছন্দের পরিবর্তন; ভিন্ন চালের বাদন আর দাপুটে চাটি। এই বয়োবৃদ্ধ বয়সে যেন যৌবন ফিরে পেতেন গানে বসলে। যাত্রার আখরাই বাদন, হোরি গানে ‘ছাইলে’ ঢোলকে চলা তুফান সবই ছিল দেখার মতো দৃশ্য!
![]()
তাঁর গানেও ছিল অন্যরকম আমেজ, তার সুরে গান করতেন, ‘ও মন হরি বলো রে, মনরে অসাধনে দিন যায় গইয়া’, ‘আমার প্রাণও বন্ধু কই গো, বলগো আমারে’ কিংবা উপভাষিক উচ্চারণে ‘বরিষ ধরা মাইজে শান্তির বারি…’ ( কবিগুরুর বরিষ ধরা মাঝে শান্তির বারি) গানটি গাইতেন প্রায় সময়।
গেল বছর চলে গেলেন লোকগানের কিংবদন্তি শিল্পী সুষমা দাশ আর আজ চলে গেলেন ক্ষীতিশ দাশ। এখন আর সেই আসর যেন শূন্য পড়ে রইলো। আসরের গুণমনিরাই চলে গেলেন। আর কে গাইবে, সূর্যব্রতের গান, কে গাইবে মালসী গান, কে গাইবে হোরি গান,’‘গগনে দিনমনি উদয় হইল ও আরে প্রাণনাথ কার কুঞ্জে রইলো,’ কে হেই বলে গলা ছেড়ে দোহার দিবে, তাল ধরবে। সেই গান আর সেই বাদনও চলে গেল প্রবাদপ্রতীম এই শিল্পীদের প্রয়াণের মধ্য দিয়ে।
সারাদিন এসব স্মৃতিই মনে পড়লো। ২০১৫ সালের কথা- আমরা তখন সংগীত পরিষদের নানা অনুষ্ঠান নিয়ে ব্যস্ত। গুরুজির বাসায় নিয়মিত বসতো গানের মহড়া। ক্ষীতিশ মামা তবলা বাজাতেন।
মামার চায়না মোবাইল ছিল, কল দিলে মোবাইলে ‘বনমালী রে রেখেছি রাখাল রাজা নাম রে নামরে ‘ গানটি বেজে উঠতো। তখন আমাদের কেউ কেউ (নাতি সম্পর্কিত) মামার মোবাইলে কল দিত। মহড়ার মধ্যে উচ্চস্বরে বেজে উঠত গান, যেই মামা কল রিসিভ করতে যাবেন অমনি গেল কেটে। মামা তারপরও কল রিসিভ করতেন, ‘হ্যালো, কে সেবা?’ সেবা উনার একমাত্র কণ্যার নাম। কল যে কেটে গেছে এটা তিনি বুঝতে পারতেন না। কিছুক্ষণ পর তিনি তা বুঝলে গলায় ঝুলানো কালো ব্যাগে আবার রেখে দিতেন। কিছুক্ষণ পরপর চলতো এই খেলা। একটা পর্যায়ে কল আসলে তিনি বিরক্ত হয়ে বলতেন ‘দূরও হালার বনমালী’।
মামা আজ ভিষণ লজ্জা লাগছে। অনুতাপ হচ্ছে। মানুষটা সারাজীবন নির্লিপ্ত কাটিয়ে দিলেন। গেল বছরের শেষের দিকে সংগীতশিল্পী নিশু দা ( নিলেন্দু ভট্টাচার্য) সঙ্গে আলাপ করেছিলাম ক্ষীতিশ মামাকে দেখতে যাব। তারপর আর যাওয়া হলো না। জীবন জীবিকা আর নানান ব্যস্ততায় যাওয়া হলো না, দেখা হলো না শেষবারের মতো। এই আক্ষেপ, অপরাধবোধ আজন্ম রয়ে যাবে। আর কী পাবো সে চরণধুলি, পরাণ সখা যে গেছে মথুরায় চলি! সংগীতের এই পূজারি চলে গেলেন ফেরার দেশে, আমাদের উপর চাপিয়ে গেলেন আজন্ম দায়। আমরা কি এই ক্ষণজন্মা গুণি শিল্পীকে যথাযথ মূল্যায়ণ করতে পেরেছি? চলে যাবার পর মনে প্রশ্ন আসে, যে কতকিছু নেওয়ার ছিল, দেওয়ার ছিল। অপূর্ণতা নিয়ে চলে গেলেন তিনি, রেখে গেলেন আমাদেরকেও অপূর্ণতায়।
ক্ষীতিশ চন্দ্র দাস ১৩৩৮ বাংলায় সুনামগঞ্জ জেলার শাল্লা থানার মামুদনগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা ক্ষেত্রমোহন দাস ও মাতা গুণমনি দাশ।
ক্ষেত্রমোহন দাশ শাল্লা অঞ্চলের একজন স্বনামধন্য বেহালাবাদক ও মা ছিলেন আসরি গানের শিল্পী। পারিবারিক ও সামাজিক সংগীত বলয়ে বেড়ে ওঠা ক্ষীতিশের। সংগীতের সাথে পরিচয় মায়ের কোলে বসেই। বাবা মার সাথে বিভিন্ন আসরে গিয়েই ঢোলকে আর খোলে হাতেখড়ি তাঁর।
ছেলের আগ্রহ দেখে বাবা তবলার গুরু রেখে দেন। পরে বড় ভাই সতীশ দাশের উদ্যোগে তৎকালিন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বেগুনা গ্রামের প্রখ্যাত ওস্তাদ নিরদ বাইনের কাছে তালিম গ্রহণ করেন ক্ষীতিশ। এর আগে শাল্লা থানার রাধাকান্ত বাইনের কাছেও তালিম নেন তিনি।
![]()
পেশাগত তবলা বাদন শুরু করেন যাত্রায় তবলা বাজানোর মধ্যে দিয়ে। ১৯৭৫ সালে শাল্লা থানার রয়েল পান্না যাত্রাদলে চাকুরি নেন। সেখানে দুইশত টাকা মাইনে বছর খানেক চাকুরি করেন। এভাবে যাত্রা দলের সাথে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে ঘুরে বেরিয়েছিলেন তিনি। গৃহস্থি ও যাত্রা সমান তালে চলতে থাকে দীর্ঘদিন।
১৯৯৬ সালে তিনি সিলেটে আসেন। সিলেটে এসে তিনি একুশেপদক প্রাপ্ত বরেণ্য সংগীত সাধক পণ্ডিত রামকানাই দাশের কাছে তালিম গ্রহণ শুরু করেন। সেই থেকে দীর্ঘ ২১ বছর ধরে সংগীত পরিষদে তবলা সহযোগী হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
পাশাপশি তিনি বাংলাদেশ শিশু একাডেমী ও সিলেট জেলা শিল্পকলা একাডেমী তে তবলা সহযোগী ছিলেন। লোকজ ধারার গানে বিশেষ বাদনে ক্ষীতিশের পারদর্শিতা চোখে পড়ার মতো। ঘাটু, কবি, উড়ি, বাউলা গান, বাউল গান, পদাবলী, মালসী, পদ্মপুরাণ, নৌকাবাইচ, সূর্যব্রত, বাঘের শিন্নী প্রভৃতি গানের সাথে তবলা বাদনে ক্ষীতিশের জুড়ি মেলা ভার।
২০১৬ সালে সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের আমন্ত্রণে লোকসংগীত শিল্পী সুষমা দাশের বিশেষ অনুষ্ঠানে তিনি তবলা সংগত করেন। এ ছাড়া তিনি সিলেটে বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের দশদিন ব্যাপি সংস্কৃতিক উৎসবে তবলা বাজিয়ে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। এছাড়া তিনি সাধক উকিল মুনশি, বাউলস¤্রাট শাহ আবদুল করিম, কারী আমির উদ্দিন, সাত্তার মিয়া, সুষমা দাশ ও প-িত রামকানাই দাশের সঙ্গে তবলা সংগত করেছেন।
তিনি ২০১৬ সালে যন্ত্র সংগীতে ‘জেলা শিল্পকলা একাডেমি পদক’ লাভ করেন। আজ রবিবার সকালে শাল্লায় নিজ বাড়িতে এই গুণি শিল্পী মৃত্যুবরণ করেন।
..................................................................................
লেখক: সাংবাদিক ও সংগীত শিল্পী
এএফ/০১