হুমকির মুখে সুরমা, তলদেশে ২০ ফুট ময়লার স্তূপ

নিজস্ব প্রতিবেদক


মার্চ ১৭, ২০২৬
১১:০৮ পূর্বাহ্ন


আপডেট : মার্চ ১৭, ২০২৬
১১:০৮ পূর্বাহ্ন



হুমকির মুখে সুরমা, তলদেশে ২০ ফুট ময়লার স্তূপ

একসময় যে নদীকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল সিলেট নগরের প্রাণ, সেই সুরমা নদী আজ ধীরে ধীরে হারাচ্ছে তার স্বাভাবিক রূপ। ভোরের আলো ফোটার পর নদীর পাড়ে দাঁড়ালে দেখা যায়, পানির উপর ভাসছে প্লাস্টিক, পলিথিন আর নানা বর্জ্য। কোথাও কোথাও পানির রঙ ঘোলা, বাতাসে হালকা দুর্গন্ধ। নদী যেন আর আগের সেই খরস্রোতা সুরমা নেই।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, নদীর বিভিন্ন অংশে ড্রেজিং করতে গিয়ে ১৫ থেকে ২০ ফুট গভীরতা পর্যন্ত ময়লা ও প্লাস্টিকের স্তূপ পাওয়া গেছে। এতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে, কমে যাচ্ছে নাব্যতা। অপরিকল্পিত নগরায়ন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাই এর প্রধান কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রতিবছর ১৪ মার্চ আন্তর্জাতিক নদীকৃত্য দিবস পালিত হলেও বাস্তবে নদী রক্ষার উদ্যোগ কতটা কার্যকর, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। দিবসটি উপলক্ষে নানা আলোচনা-সেমিনার হলেও সুরমার বর্তমান অবস্থা তার উল্টো চিত্রই তুলে ধরে।

ইতিহাস বলছে, একসময় সিলেটের যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেকটাই নির্ভরশীল ছিল এই নদীর ওপর। ১৮৫৩ সালের আগে স্থলপথের অবস্থা ছিল নাজুক, তাই ব্যবসা-বাণিজ্যের মালামাল পরিবহন হতো নদীপথে। ছোট ছোট নৌকা ছিল যাতায়াতের প্রধান ভরসা। সেই নদীই এখন নগরের বর্জ্যের ভারে জর্জরিত।

নদীপাড়ের বাসিন্দাদের অভিযোগ, কয়েক বছর ধরে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। পানিতে দুর্গন্ধ, ভাসমান আবর্জনা আর দূষণের কারণে নদীর পানি ব্যবহার করাও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবু বিকল্প না থাকায় অনেকে বাধ্য হয়ে সেই পানি ব্যবহার করছেন।

নগরের এক বাসিন্দা জিল্লুর রহমান বলেন, “নদীর এমন অবস্থা হইছে যে এই পানি ব্যবহার করার মতো না। তারপরও আমরা গোসল করি, বাসন ধুই, কারণ আর কোনো উপায় নাই।”

স্থানীয়দের মতে, নগরের বিভিন্ন খাল ও ছড়া দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য এসে পড়ছে নদীতে। ড্রেন ও খালগুলো নিয়মিত পরিষ্কার না থাকায় প্লাস্টিক ও পলিথিন সরাসরি সুরমায় গিয়ে জমছে। এতে শুধু পানির গুণগত মানই নষ্ট হচ্ছে না, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

সুরমা রিভার ওয়াটার কিপার আব্দুল করিম।কিম বলেছেন, 'সুরমাকে বাঁচাতে হলে প্রথমেই বর্জ্য নদীতে পড়া বন্ধ করতে হবে। শহরের খাল ও ছড়াগুলো সচল রাখা এবং কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা জরুরি।'

পানি উন্নয়ন বোর্ডের সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাশ বলেন, “খাল থেকে যে ময়লা যায়, সবই নদীতে গিয়ে পড়ে। ড্রেজিং করতে গিয়ে আমরা দেখেছি, ১৫ থেকে ২০ ফুট পর্যন্ত ময়লার স্তূপ জমে আছে।”

তিনি আরও বলেন, সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা গেলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব। যত্রতত্র ময়লা ফেলা বন্ধ করলেই নদীর প্রবাহ অনেকটা স্বাভাবিক রাখা যাবে।

এ বিষয়ে সিলেট সিটি কর্পোরেশন–এর প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, “নদী দূষণ রোধে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে অনেক সময় কাজ শেষ হওয়ার আগেই বর্ষা মৌসুম চলে আসে। সিটি করপোরেশন কাজ করছে, তবে এ ক্ষেত্রে নগরবাসীর সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে সুরমার অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়তে পারে। শুধু প্রশাসনিক উদ্যোগ নয়, নাগরিক সচেতনতা আর সমন্বিত ব্যবস্থাপনাই পারে এই নদীকে ফিরিয়ে দিতে তার পুরোনো প্রাণ।

আরসি-০২