কাজে ফিরতে মরিয়া যাদুকাটার শ্রমিকরা

আবির হাসান-মানিক, তাহিরপুর


মে ০৪, ২০২১
০৯:২১ অপরাহ্ন


আপডেট : মে ০৪, ২০২১
০৯:২১ অপরাহ্ন



কাজে ফিরতে মরিয়া যাদুকাটার শ্রমিকরা

ভারতের খাসিয়া জৈন্তিয়া পাহাড় থেকে উৎপন্ন সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী নদী যাদুকাটায় ইজারা জটিলতা ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণ দেখিয়ে সরকারি নিষেধাজ্ঞায় কাজ বন্ধ থাকায় কর্মহীনতায় ধুঁকছেন বালু-পাথর শ্রমিকরা। এর মধ্যে যুক্ত হয়েছে মহামারি করোনাভাইরাস। গেল বছর থেকে করোনাভাইরাসের কারণে দফায় দফায় লকডাউন আর নানাবিধ বিধিনিষেধের কারণে হাওরপাড়ের নিম্নআয়ের লোকজন নানামুখী সংকটে আছেন। হাওর থেকে নদী- সবখানের মানুষের মাঝে এখন শুধু কর্মমুখর জীবনে ফিরে যাওয়ার আর্তনাদ।

গত বছরজুড়েই যাদুকাটার শ্রমিক ও ব্যবসায়িক সমিতিগুলো নদীতে কাজের দাবিতে বিভিন্ন সময় মানববন্ধন, শ্রমিক সমাবেশ করেছে। কারণ এ অঞ্চলের শ্রমজীবী মানুষেরা শুধু জানেন কাজ করলে মিলবে মজুরি। আর সেই মজুরিতেই জ্বলবে রান্নাঘরের চুলা। শ্রমিকরা জানান, শ্রমের ন্যায্য মজুরি এই মুহূর্তে তাদের চাওয়া নয়। এখন বেঁচে থাকার জন্য অন্তত একটা কাজ চাই।

দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় নদী যাদুকাটাকে ঘিরে তাহিরপুর উপজেলাসহ পার্শ্ববর্তী আরও দু'টি উপজেলার প্রায় লক্ষাধিক বালু-পাথর শ্রমিক নদী থেকে বালু ও পাথর, নুড়ি পাথর, আবার কখনও ওপার থেকে ভেসে আসা কয়লা কুড়িয়ে জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। কিন্তু যাদুকাটা নদীর ফাজিলপুর নামক বালু-পাথর মহালে ইজারা জটিলতার নিরসন না হওয়ায় এবং পরিবেশের বিপর্যয়ের কারণে সরকারি নিষেধাজ্ঞার ফলে কাজ হারিয়ে বসে আছেন এসব শ্রমজীবী মানুষরা। কর্মহীন এসব শ্রমিকদের কেউ কেউ আবার কাজের সন্ধানে শহরমুখী হতে চেষ্টা করছেন। কিন্তু মহামারি করোনা পরিস্থিতির কারণে তাদের জীবিকা নির্বাহের অন্য পথও থমকে গেছে।

এদিকে, সাম্প্রতিক সময়ে তাহিরপুরের হাওরগুলোতে চলছে বোরো ধান কাটার কার্যক্রম। উপজেলার সর্বত্র যখন কাজের জন্য ছুটোছুটি আর হাহাকার, ঠিক সে সময় ধান কাটার কাজে লেগেছেন কর্মহীন শ্রমিকরা। এই সময়ে পুরো মৌসুম ধান কাটলে হাওরের নিয়ম অনুযায়ী মজুরি হিসেবে ধান কিংবা অর্থ পেলে বছরের একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত খেতে পারবেন ঘরের চাল। এতে হয়তো কিছুটা স্বস্তি মিলছে। তবে সেই স্বস্তি যে স্থায়ী নয়, সেটি ভালো করেই জানেন এসব শ্রমিকরা। সেজন্য বছরজুড়ে কাজ চান তারা।

উপজেলার বাদাঘাট ইউনিয়নের গড়কাটি গ্রামের বালু-পাথর শ্রমিক তার ৮ম শ্রেণিতে পড়ুয়া ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে বর্তমানে ধান কাটার কাজে ব্যস্ত রয়েছেন। তবে ধান কাটা শেষে বাড়ি ফিরে নিয়মিত কর্মজীবনে ফিরতে পারবেন না বলে আশঙ্কা তার। তিনি বলেন, ‘করোনার লাইগ্যা স্কুল বন্ধ থাহায় ছেলেরে লগে লইয়্যাই ধান কাটার কাজে আইছি। নদীতে যেহেতু কাম বন্ধ, ধান কাটা শেষ হইলে কী করমু তাও বুঝতেছি না।’

তাহিরপুর সদর ইউনিয়নের গোবিন্দশ্রী গ্রামের শ্রমিক নাসির উদ্দীন লকডাউনে কাজ হারিয়ে রাজধানীতে জীবিকা নির্বাহ করতে গিয়ে সংকটে পড়েন। পরে ধান কাটা শুরু হওয়ামাত্র এলাকায় ফিরে ধান কাটার কাজে লেগে পড়েছেন তিনি। আক্ষেপ নিয়ে নাসির উদ্দীন বলেন, ‘ঢাকায় যে কামে আছিলাম, লকডাউনে তাও ছুটে গেছে। এহন বাড়িতে আইছি, কয়দিন ধান কাটমু। পরে নতুন কইরা কাম না পাওয়া পর্যন্ত বাড়িতেই থাকতে হইব। এছাড়া কী আর করার আছে?’

উপজেলার মানিগাঁও গ্রামের নারী শ্রমিক রওশানা বেগম ৫ ছেলে-মেয়ে নিয়ে যাদুকাটা নদীতে কাজ করতেন। কিন্তু সেই দিন আর নেই। নিরুপায় রওশানা বেগম শেষমেশ একটি এনজিও’র দ্বারস্থ হন। ঋণ নিয়ে বড় দুই ছেলেকে অটোরিকশা কিনে দেন। এ দিয়ে যা আয় হতো, তা দিয়েই ঋণের কিস্তি আর সংসার চলত। কিন্তু বিভিন্ন সময়ের লকডাউনে সেখানেও আয় নেই। ওই নারী শ্রমিক বলেন, ‘বাচ্চাদের বাপ মারা গেছে আইজকা ৩ বছর। হেরপর থেইকা সংসারের হাল ধরতে গিয়া যাদুকাটা নদীতে আমি নিজেই কামে নামি। কিন্তু নদীর কাম বন্ধ থাহনে পড়ি মুসিবতে। পরে কিস্তি তুইল্যা ছেলে দুইডারে অটোরিকশা কিইন্যা দেছি। কিন্তু তাতে কী আর সংসারের অভাব দূর হয়?’

উপজেলার বৃহৎ কেনাবেচার স্থল বাদাঘাট বাজারে অস্থায়ী (অঘোষিত) ভাড়ায় চালিত ৩-৪টি মোটরসাইকেল স্ট্যান্ড রয়েছে। সেখানে শতাধিক পেশাদার মোটরসাইকেলচালক যাত্রী পরিবহনের কাজ করেন। এসব পেশাদার মোটরসাইকেলচালকরা জানান, ‘নদী বন্ধ। সেজন্য মাইনষের হাতে কাম নাই। আর আমরাও দিনের বেশিরভাগ সময়ই বইয়্যা পার করি। আর করোনার জন্য মাঝে-মধ্যে লকডাউন দিলে গাড়ি নিয়া বাজার থেইকা শহরমুখীও হওন যায় না।’

এ অবস্থায় উপজেলার সচেতন মানুষের দাবি, হাওরাঞ্চলের মানুষের জন্য বছরজুড়ে কাজের ব্যবস্থা করতে হবে, কর্মসংস্থানের বিকল্প পথ তৈরি করতে হবে। এই বিকল্প পথ তৈরি করা না গেলে হাওরাঞ্চলের মানুষের কাজের নিশ্চয়তা মিলবে না। মিলবে না স্বস্তির জীবনও। অভাব-অনটনের জীবনেরও কোনো পরিবর্তন হবে না। সেজন্য সরকারের উচিত এসব এলাকার মানুষদের কথা চিন্তা করে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করে কাজ করা। যাতে এসব এলাকার মানুষের জীবনমানের পরিবর্তন ঘটে।

এ ব্যাপারে সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকায় যাদুকাটা নদীতে কাজ বন্ধ রয়েছে। বর্তমানে এ অঞ্চলের শ্রমিকরা হাওরে ধান কাটার কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। সরকারি নিষেধাজ্ঞা ও অন্যান্য জটিলতার নিরসন না হওয়া অবধি যাদুকাটা নদীতে কোনো কাজ করা যাবে না।'

 

এএইএচ/আরআর-০৩