দেশ-বিদেশে বাউল রণেশ ঠাকুরের প্রতি সংহতি, সহযোগিতার ঘোষণা

বিশেষ প্রতিনিধি


মে ২০, ২০২০
০৯:৫৪ পূর্বাহ্ন


আপডেট : মে ২০, ২০২০
০৯:৫৬ পূর্বাহ্ন



দেশ-বিদেশে বাউল রণেশ ঠাকুরের প্রতি সংহতি, সহযোগিতার ঘোষণা

বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের শিষ্য বাউল রণেশ ঠাকুরের গানের আসরঘর ও ৪০ বছরের সংগৃহীত সঙ্গীত উপকরণ পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় নিন্দার ঝড় বইছে দেশ-বিদেশে। সুধীজন ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের নেতাকর্মীরা এ ঘটনাকে মৌলবাদী শক্তির কাজ বলে অভিহিত করে তদন্তের মাধ্যমে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। 

এদিকে, ক্ষতিগ্রস্ত বাউলের পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে প্রশাসন ও দেশ বিদেশে অবস্থানরত বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠন। তারা এ ঘটনায় ক্ষোভ ও নিন্দা জানিয়ে বাউলের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করে তাকে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। অনেকে ব্যক্তিগতভাবে ফোন করে তাকে সমবেদনা ও সহযোগিতার কথা জানান।

সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসকের নির্দেশে দিরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ ঘটনায় মঙ্গলবার বিকেলে বাউলের বাস্তুভিটা দেখতে গিয়ে তাকে শান্তনা জানিয়ে নগদ ২০ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা দিয়ে এসেছেন। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ জানিয়েছেন জেলা প্রশাসন বাউল রণেশ ঠাকুরের গানের আসরঘর নির্মাণ করে দেবে। জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার এম. এনামুল কবির ইমন বলেছেন, তিনি বাউলের শখের দোতারাটি কিনে দেবেন। লন্ডনপ্রবাসী গীতিকবি সৈয়দ দুলায় বাউলকে ২০ হাজার টাকা মূল্যের হারমোনিয়াম কিনে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক লেখক-গবেষক-ব্লগার অমি রহমান পিয়াল তার হাতের কালো রিস্ট ব্যান্ড ১ লক্ষ টাকা নিলামে তুলে বাউলকে সহযোগিতার উদ্যোগ নিয়েছেন। এভাবে বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠন বাউলের প্রতি সহমর্মিতা জানিয়ে তাঁর পাশে দাড়াচ্ছে। তাছাড়া আমেরিকা প্রবাসী সুনামগঞ্জের সন্তান সুফিয়ানও বাউলের ক্ষতিগ্রস্ত ঘর নির্মাণ করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে বাউল রণেশ ঠাকুরের গানের আসরঘরের পাশে উদ্দেশ্য প্রণোদিদভাবে কিছু ব্যক্তি ঈর্ষান্বিত হয়ে দীর্ঘদিন ধরে সাম্প্রদায়িক আক্রোশে মুসলিম ধর্মীয় একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করার চেষ্টা করছে। এ ঘটনায় প্রয়াত জাতীয় নেতা ও দিরাই শাল্লা আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্তও প্রতিবাদ করেছিলেন। স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মীরাও এর প্রতিবাদ করে আসছেন। তারা বলেছেন, গ্রামে একাধিক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তাছাড়া নতুন করে করতে হলে আরও উন্নত অনেক স্থানও রয়েছে। কিন্তু বাঙালির সাহিত্য, সংস্কৃতি ও বাউল বিরোধী ওই গোষ্ঠী চাচ্ছে বাউলের গানের ঘরের পাশেই প্রতিষ্ঠানটি করতে। যাতে বাউলের আসর থেমে যায়। সংস্কৃতিকর্মীদের প্রতিবাদের মুখে সেটা করতে পারছে না। তাই এবার তার ঘর পুড়িয়ে দিয়েই তারা এই কাজটি করতে চাচ্ছে এমন অভিযোগ উঠেছে। 

সংস্কৃতি কর্মীদের অভিযোগ এলাকার ওই চক্র এর আগে শাহ আবদুল করিমের বাড়িতেও গানের আসরে হামলা করেছিল। যৌবনে আবদুল করিমকে ননাভাবে মানসিক নির্যাতন করেছিল। ফতোয়া দিয়ে তাকে একঘরেও করেছিল। তারা এই চক্রেরই নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি। যারা বংশ পরম্পরায় বাউল মত, পথ ও দর্শনের বিরোধী।

বাউল রণেশ ঠাকুরের ভক্তরা জানান, গত রবিবার গভীর রাতে তার গানের আসর ঘরে আগুন দেয় দুবৃত্তরা। এতে তার ৪০ বছরের সংগৃহীত সঙ্গীত উপকরণ, গানের খাতা ও নিজের রচিত গানের খাতাটিও পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এ ঘটনায় তিনি নির্বাক হয়ে গেছেন।

সংস্কৃতিকর্মী আপেল মাহমুদ বলেন, বাউল সম্রাটকেও ওই চক্রের পূর্বপুরুষরা নানাভাবে অত্যাচার করেছে। তার সঙ্গীতযাত্রা থামিয়ে দিতে চেয়েছিল। তখন রণেশ ঠাকুরের বাবাসহ এলাকার প্রভাবশালীরা বাউলের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। আজ বাউলের শিষ্যের ঘর পুড়িয়ে তারা বাউল বংশ নির্মূল করতে চায়। এদের কঠিন শাস্তি দাবি করেন তিনি।

বাউল রণেশ ঠাকুর বলেন, আমি প্রশাসন, দেশ বিদেশের বাউল অনুরাগীদের প্রতি কৃতজ্ঞ। তারা আমাকে যেভাবে সমর্থন দিয়েছেন তাতে আবারও কণ্ঠে গান তুলে নেওয়ার সাহস দেখছি। তিনি বলেন, ‘ভাইরে আমার সবতা পুড়ে শ্যষ। ৪০ বছরের সাধনা ছাই। ১শর বেশি গান লেখছিলাম, হেই খাতাটিও পুইরা গ্যাছে। সাধের দোতারা, একতারা, হারমোনিয়াম, ছইট্যারা, ঢোল-খরতাল কুন্তা বাকি নাই।’

সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ বলেন, ‘আমরা বাউলের আসর ঘর বানিয়ে দেবো। এছাড়াও প্রশাসন দোষীদের খুঁজে বের করতে কাজ করছে। তাদের শাস্তির আওতায় আনা হবে।

এসএস/এনপি-০৩