জামালগঞ্জে হাওর রক্ষা বাঁধে অক্ষত মাটি, বরাদ্দ পুরোনো আদলেই

বিশ্বজিত রায়, জামালগঞ্জ


জানুয়ারি ২৯, ২০২২
১২:০০ অপরাহ্ন


আপডেট : জানুয়ারি ২৯, ২০২২
১২:০০ অপরাহ্ন



জামালগঞ্জে হাওর রক্ষা বাঁধে অক্ষত মাটি, বরাদ্দ পুরোনো আদলেই

জামালগঞ্জে মন্থর গতিতে এগুচ্ছে হাওর রক্ষা বাঁধের কাজ। নির্ধারিত সময়ের প্রায় দেড় মাস অতিবাহিত হলেও হাওরের অনেক বাঁধে এখনও পড়েনি একছটাক মাটি। যে কয়টিতে মাটি ফেলা শুরু হয়েছে তাতেও তেমন সন্তোষজনক অগ্রগতি নেই। মাটি ফেলায় মানা হচ্ছে না কোন নিয়মনীতি। কাজ শুরু হওয়া বাঁধগুলোতে শ্রমিকের দেখা মিললেও পাওয়া যায়নি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির কোন লোককে। কোন কোন বাঁধে কাজ শুরুর আলামত পর্যন্ত চোখে পড়েনি।

এমন শঙ্কিত পরিস্থিতিতে অনেক বাঁধে বরাদ্দের পরিমাণও বেশি হয়েছে বলে কথা উঠছে। গত বৃহস্পতিবার হালি, শনি ও মহালিয়া হাওর ঘুরে এমন দৃশ্য চোখে পড়েছে। তবে সে তুলনায় পাগনা হাওরে কাজের গতি কিছুটা ভালো বলে জানা গেছে।

এদিকে, প্রকল্প বরাদ্দে অনিয়মের পাশাপাশি স্বজনপ্রীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। বেশ চতুরতার সাথে এ বছর পিআইসি তালিকা থেকে চাটাই করা হয়েছে বাঁধের কাজে যুক্ত করা লোকের ঠিকানা। গণমাধ্যমকর্মীদের চোখে ধুলো দিতেই সম্ভবত এ প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে।

পিআইসি তালিকায় নামকাওয়াস্তে কৃষকের নাম থাকলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বাঁধের কাজ ভাগিয়ে নিয়েছে মধ্যস্বত্বভোগীরা। বাঁধের কাজ বাস্তবায়নের নীতিমালা অনুযায়ী হাওর পারের প্রকৃত কৃষক ও কাজের সামর্থ রাখে এমন লোককে বাঁধ রক্ষা কাজে যুক্ত করার কথা থাকলেও বাস্তবে ঘটেছে তার উল্টো।

কৃষকের নাম করে হাওর থেকে দূরবর্তী স্থানের বাসিন্দা, অকৃষক এবং গেল ইউপি নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া লোকদেরকেও সম্পৃক্ত করা হয়েছে বাঁধ রক্ষা কাজে। এতে বাঁধের কাজে অভিজ্ঞ ও সক্ষমতা রাখেন এমন কৃষককে বঞ্চিত করা হয়েছে। এ নিয়ে হাওরপারে অসন্তোষ বিরাজ করছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কৃষকের বদলে বাঁধের কাজে নেতৃত্ব দিচ্ছে রাজনৈতিক, সদ্য ইউপি নির্বাচনে বিজয়ী জনপ্রতিনিধি এবং হাওর থেকে অনেক দূরের সুযোগসন্ধানী লোকেরা। জামালগঞ্জ উত্তর ইউনিয়নে অবস্থিত হালির হাওরের ৯ নম্বর পিআইসির সভাপতি করা হয়েছে ফেনারবাঁক ইউনিয়নের শেষ সীমানায় অবস্থিত নিধিপুর গ্রামের রেন্টু সরকারকে।

এছাড়া এ প্রকল্পে রাখা হয়েছে একেক ইউনিয়নের একেকজনকে। মহালিয়ার ৪টি পিআইসিতে যদিও কাগজে কলমে হাওর পারের কৃষকের নাম রয়েছে, তবে এর মধ্যে দু’টিতে সদ্য বিজয়ী এক জনপ্রতিনিধি ও অপর দু’টিতে আছে হাওর থেকে দূরবর্তী স্থানের এক মধ্যস্বত্বভোগী।

শনির হাওরেও প্রায় একই অবস্থা। অনেক পিআইসিতেই কৃষক নাম করে সুযোগ নিয়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, আওয়ামীলীগ নেতা ও এমপি বলয়ের লোকজনসহ প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের ঘনিষ্ঠজনেরা বলে জানা গেছে।

হাওর ঘুরে দেখা যায়, গত বর্ষা মৌসুম অনেকটা শুষ্ক থাকায় শনির হাওরের বিপজ্জনক ক্লোজার হিসেবে পরিচিত লালুরগোয়ালা, হালি হাওরের সুন্দরপুর কালীবাড়ি ক্লোজার, মামুদপুরের ভাঙা, ঘনিয়ার বিলের ভাঙাসহ ছোটখাটো যেসব ক্লোজার ছিল প্রায় সবগুলোতে বেশির ভাগ মাটি অক্ষত আছে। এসব ক্লোজার ছাড়াও বেশকিছু বাঁধে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ ভাগ মাটি রয়ে গেছে। তারপরও সবকিছু মিলে বরাদ্দ এসেছে গত বছরের সমান। এ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

তবে মদনাকান্দি গ্রামের বিপরীতে মহালিয়া হাওরের নদীর তীরবর্তী অংশে একটি বিপজ্জনক ক্লোজারের সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া ঘনিয়ার বিলের বিপরীত পারে শনি হাওর অংশে আরেকটি বড় ভাঙন রয়েছে। এ দুটো ভাঙনই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে হয়েছে। তবে ঝুঁকিপূর্ণ এ দুটি ক্লোজারেও কাজের গতি নাজুক।

জানা যায়, গেল মৌসুমে উপজেলার ৬টি হাওরের ৪৪টি পিআইসিতে বরাদ্দ ছিল ৫৯১.৫৭ লাখ টাকা। সে বছর উপর্যুপরী বন্যায় বাঁধের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল। কিন্তু চলতি বছরে কমেছে ৮টি পিআইসি। এবার ৩৬টি পিআইসিতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৫২২.৫৭ লাখ টাকা। গেল বর্ষা মৌসুমে হাওরে তেমন পানি ছিল না, তবু বরাদ্দ এসেছে গত বছরের সমান। মনগড়া প্রাক্কলন করে এমন বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন হাওর পারের সচেতন মানুষেরা।

অপরদিকে, হাওর ঘুরে বাঁধ রক্ষা কাজ ৩০ ভাগও এগিয়েছে বলে মনে হয়নি। এর মাঝে কেটে গেছে নির্ধারিত সময়ের প্রায় দেড় মাস। হালি হাওরের বদরপুর অংশ, মামুদপুরের ভাঙা থেকে দুর্গাপুর অংশ, মদনাকান্দি পশ্চিমের একটি অংশ, হরিপুর থেকে আছানপুর ও হরিপুর থেকে সুন্দরপুরের ২টি অংশ, কালিবাড়ি থেকে উলুকান্দির মাঝ বরাবর ২টি অংশ এবং শনির হাওরের ৪টি পিআইসির মধ্যে ২টি ও মহালিয়ার ৪টির মধ্যে ১টি পিআইসিতে কেবল মাটি ফেলার কাজ শুরু হয়েছে। অন্যসব বাঁধে কাজ শুরুর কোন আলামত চোখে পড়েনি।

মাটি ফেলা শুরু হয়েছে এমন কয়টি বাঁধে নির্দেশিকা বোর্ড সাটানো থাকলেও বাকি কোন বাঁধে কাজ দূরের কথা নির্দেশিকা বোর্ড পর্যন্ত সাঁটানো হয়নি। এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছে হাওর পারের মানুষ। কারণ ২০১৭ সালের প্রলঙ্করী হাওর বিপর্যয়ের পর টানা চার বছর প্রকৃতি অনুক‚লে ছিল, যদি এ বছর প্রকৃতি বেঁকে বসে তাহলে হাওরে আবার বিপর্যয় নেমে আসবে। তাই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে হাওর রক্ষা বাঁধের কাজ শেষ করার তাগিদ দিয়েছেন হাওর সচেতন মানুষেরা।

হাওর বাঁচাও আন্দোলনের ফেনারবাঁক ইউনিয়ন সভাপতি মো. শাহাব উদ্দিন বলেন, আসলে এ বছর বরাদ্দ বেশিই মনে হচ্ছে। গত বর্ষায় তো তেমন পানি হয়নি, বাঁধও ভাঙ্গেনি। তারপরও বরাদ্দ গত বছরের সমান। এখন দেখা যাক কাজ কতটুকু হয়।

পিআইসি কাজে অভিজ্ঞতা রাখেন এমন একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, গত দুই বছর আগে মাহমুদপুরের ভাঙ্গা থেকে দুর্গাপুর পর্যন্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল ৭ লাখ টাকা। কিন্তু এবার একই বাঁধে মাটি থাকার পরও বরাদ্দ এসেছে ১৫ লাখ টাকা। এভাবে কোথাও বরাদ্দ বেড়েছে কোথাও বরাদ্দ গত বছরের সমান থেকেছে। অনেকে এ নিয়ে বিরূপ মন্তব্যও করছেন। এছাড়া প্রকৃত কৃষক এবং সামর্থ রাখে এমন কেউই পিআইসি পায়নি বলে জানিয়েছেন তিনি।

হালি হাওর পারের কৃষক রফিকুল ইসলাম তালুকদার ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, প্রকৃত কৃষক যারা, প্রকৃত কাজে অভিজ্ঞ যারা তারা কাজ পায় না। বিগত ৪০ বছর ধরে হাওর উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছি, এবার পিআইসির জন্য কমিটি জমাও দিয়েছিলাম কিন্তু পাইনি।

বেহেলী ইউনিয়নের নবনির্বাচিত ইউপি চেয়ারম্যান সুব্রত সামন্ত সরকার বলেন, আমাদের পুরো ইউনিয়নটাই হাওরবেষ্টিত। এখানকার মানুষের জীবন-জীবিকাও হাওরের উপর নির্ভরশীল। ২০১৭ সালের পর গত কয়েক বছর ফলনও ভালো হয়েছে, প্রকৃতিও সুবিধা দিয়েছে। এবার প্রকৃতি বৈরি আচরণ করতে পারে। এটা মাথায় রেখে হাওর রক্ষা বাঁধের কাজে জোর দিতে হবে। সংশ্লিষ্ট সকলকে এ আহŸান জানাই।

এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি বিশ্বজিত দেব বলেন, বাঁধের একটি পয়েন্টে কাজ শুরু হলে এই অংশের পুরোটাই ধরে নেওয়া হয়। সে মোতাবেক ৩৬টি পিআইসির মধ্যে ২টি ছাড়া বাকি সবগুলোতেই কাজ শুরু হয়েছে। বরাদ্দের যে ব্যাপারটা সেটা প্রাক্কলন অনুযায়ী হয়েছে। সেখানে বরাদ্দ বাড়ানোর কোন সুযোগ নেই। আর জামালগঞ্জ উত্তর ইউনিয়নের শেষ মাথায় যে প্রকল্পটি আছে সেটি সব শেষে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সেখানে কাছের কেউ এগিয়ে আসেনি বিধায় একটু দূর থেকে পিআইসি করা হয়েছে। তবে হালির হাওরে তার জমি আছে।

আরসি-০৫