সোহেল তালুকদার, শান্তিগঞ্জ প্রতিনিধি
ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০২২
০৬:৫২ অপরাহ্ন
আপডেট : ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০২২
০৬:৫২ অপরাহ্ন
সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার জামখালা হাওরের বাঁচাডুবি বিলের ইজারাদারের বিরুদ্ধে নীতিমালা অমান্য করে বিল শুকিয়ে মৎস্য নিধনের অভিযোগ উঠেছে। এ জন্য হাওরটির ফসল রক্ষা বাঁধও কেটে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
তারা বলছেন, বাঁধটি কেটে দেওয়ায় এখন পুরো জামখলা হাওরটিই অরক্ষিত হয়ে পড়েছে। হুমকির মুখে কয়েকশ হেক্টর বোরো ফসল।
হাওরের কৃষকরা জানিয়েছেন, সরকার প্রতি বছর হাওরের ফসল রক্ষায় ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করে আসছে। কিন্তু আমাদের হাওরের একটি প্রভাবশালী অসাধু চক্র সাবলিজ এনে মৎস্য নিধনের জন্য হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ কেটে বিলের পানি শুকাচ্ছেন। বাঁধটি ভেঙে দেওয়ায় কৃষকরা বোরো ফসল নিয়ে শঙ্কায় আছেন।
সরেজমিনে গত মঙ্গলবার দুপুরে দরগাপাশা ইউয়িনের জামখালা হাওরের বাঁচাডুবি বিলে গিয়ে দেখা যায়, বিলটির পানি একেবারেই শুকিয়ে তলদেশে পানি চলে গেছে, বিলের অনেক অংশে ইজারাদারের লোকজন মাছ ধরে খলায় নিয়ে আসছেন। পুরো বিল জুড়ে যেন মাছ ধরার উৎসব চলছে। নীতিমালা অমান্য করে চলছে এই চক্রের মৎস্যনিধন। ধরমপুর সলফ গ্রামের মাঝখানে গিয়ে দেখা যায়, একটি সড়ক কেটে দিয়ে এই জলাশয়ের পানি বের করা হচ্ছে। ২০১৭-২০১৮ অর্থ বছরে সড়কটি নির্মাণ করে পানি উন্নয়ন বোর্ড। এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে এই খালটি একেবারেই বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর থেকে এই বাঁধটি ধরমপুর সলফ গ্রামের লোকজন সড়ক হিসেবেই ব্যবহার করে আসছেন। কিন্তু ইজারাদাররা এই খালের বাঁধটি এ বছর কেটে দিয়ে তাদের বিল শুকিয়ে মৎস্য আহরণ করছেন। এ জন্য এই হাওরের কৃষকরা শঙ্কায় আছেন। তারা বলছেন, হাওরে আগাম বন্যা হলে খাল দিয়ে পানি প্রবেশ করতে পারে। আর এতে নষ্ট হয়ে যেতে পারে সমস্ত বোরো ফসল।
উপজেলা সমবায় অফিস সূত্রে জানা যায়, জামখালা হাওরের বাঁচাডুবি জলমহালটি ১৪২৬ বাংলা থেকে ১৪৩১ বাংলা পর্যন্ত ৬ বছর মেয়াদে দরগাপাশা মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেড নামের এই সংগঠনটি ইজারাপ্রাপ্ত হয়। সমিতির সভাপতি দরগাপাশা গ্রামের মো. ছারু মিয়া, সাধারণ স¤পাদক মো. সাহিদ মিয়া। অন্তর্বর্তীকালীন ৩ সদস্য বিশিষ্ট ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি মো. সমসর উল্লা, সদস্য মো. আজির উদ্দিন ও মো. হুরমত উল্লা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ধরমপুর, সলফ গ্রামের অনেক কৃষকরা বলেন, এই বিলটি সাবলিজে এনেছেন লাউগাং (উমেদনগর) গ্রামের জানার মিয়া, সাবেক মেম্বার হারুন মিয়া, সলফ গ্রামের ইমরাজুল খান, শাহান মিয়া, কুতুব উদ্দিন। তাদের বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করতে পারে না। তারা খুবই প্রভাবশালী। তারা প্রভাব খাটিয়ে আমাদের সড়কটি কেটে দিয়েছে। এখন গ্রামের লোকজন চলাচল করতে পারছেন না। সেই সঙ্গে আমাদের হাওরের ফসল নিয়ে আমরা আশঙ্কায় আছি। যে কোনো সময় আমাদের হাওরের ফসল পানিতে তলিয়ে যেতে পারে। প্রশাসনের কেউ কোনো ব্যবস্থা নেননি। তারা আরও বলেন, এই বিলটির ইজারাদার দরগাপাশা মৎম্যজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি ছানু মিয়া ও সাধারণ স¤পাদক মো. সাহিদ মিয়া থাকলেও মূলত তারা কিছুই না। এদের নামে সমিতি থাকলেও সমিতির মহাজন দরগাপাশা গ্রামের তৌহিদ খুরশিদুজ্জামান চৌধুরী নাজমুল।
দরগাপাশা গ্রামের তৌহিদ খুরশিদুজ্জামান চৌধুরী নাজমুল বলেন, এই বিলটি আমার চাচাত ভাইরা ইজারা এনেছেন, আমি তাদেরকে বিল ফিসিং করতে টাকা পয়সা দিয়ে সহযোগিতা করে আসছি। সমিতি গঠন থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত আমার অবদানেই এই সমিতি চলমান আছে। মূলত এই বিলটি ফিসিং করছে ভাগিদাররা। এতো বড় বিল একা ফিসিং করা যায় না বিদায় সমিতির লোকজন ভাগিদার হিসেবে এলাকার লোকজনকে সম্পৃক্ত করেছেন। বিলের পানি শুকিয়ে মাছ আহরণের জন্য বাঁধটি কেটে দিয়েছি। এই খালদিয়েই আমাদের বিলের পানি শুকাতে হয়। তবে আমি কারো অনুমতি নেইনি। সাবলিজের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এতো বড় বিল একা তো ফিসিং করা যায় না, তাই এলাকার কিছু মানুষকে ভাগিদার বানিয়েছি। এখন মূলত তারাই ফিসিং করছেন।
বিলের ইজারাদার দরগাপাশা মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি ছানু মিয়া বলেন, বিলটি ইজারা এনে ভাগিদারদের দিয়ে ফিসিং করাচ্ছি। বাঁধ কেটে না দিলে আমাদের বিলের মাছ ধরা যাবে না, তাই ভাগিদাররা বাঁধ কেটে দিয়েছেন। দরগাপাশা গ্রামের তৌহিদ খুরশিদুজ্জামান চৌধুরী নাজমুল আমাদেরকে অফিসিয়াল সহযোগিতা করেন, তিনি বিল ইজারা পেতে অফিসের কাজে সহযোগিতা করেন ও আমাদের টাকার প্রয়োজন হলে তিনিই আমাদেরকে টাকা দিয়ে সহযোগিতা করেন। ভাগিদার সম্পৃক্ত করার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের সমিতিতে লোকজন দিয়ে ফিসিং করা যায় না। তাই দুই তিন গ্রামের লোকজনকে বিলের ভাগিদার দেওয়া হয়েছে। তারাই আমাদের বিলটি ফিসিং করছেন।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলাম বলেন, বিল শুকিয়ে মাছ আহরণের কোনো সুযোগ নেই। আমি ইউএনও স্যারকে অবহিত করেছি। উনার পরামর্শ অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মাহবুব আলম বলেন, এই বাঁধটি ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে সম্পূর্ণ রূপে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল যাতে করে এই এলাকার মানুষের হাওরের ফসল আগাম বন্যা থেকে রক্ষা পায়। কিন্তু একটি অসাধু চক্র তাদের জলমহাল ফিসিং করার জন্য বাঁধটি কেটে দিয়েছে। এ ব্যাপারে উপজেলা কমিটি পরবর্তী ব্যবস্থা নেবেন।
শান্তিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আনোয়ার উজ জামান বলেন, আমি পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলীকে বলেছি, বিলের ইজারাদারকে ডেকে এনে তাদের সঙ্গে কথা বলার জন্য বলেছেন। এই বাঁধটি বিলের ইজারাদাররা বেঁধে দিতে হবে। তবে কোন কারণে তারা বাঁধটি মেরামত না করলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে মেরামত করা হবে।
আরসি-১০