ফ্রান্সকে বিদায় করে ফাইনালে স্পেন

সিলেট মিরর ডেস্ক


জুলাই ১৫, ২০২৬
০৫:০১ পূর্বাহ্ন


আপডেট : জুলাই ১৫, ২০২৬
০৫:০১ পূর্বাহ্ন



ফ্রান্সকে বিদায় করে ফাইনালে স্পেন


পুরো টুর্নামেন্টে যে দাপটের সঙ্গে খেলে সেমিফাইনালে উঠে এসেছিল ফ্রান্স, ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে তাদেরকে তেমনটা দেখা গেলো না। পুরো টুর্নামেন্টের তুলনায় পুরোপুরি নিষ্প্রভ। কিলিয়ান এমবাপেকে ঠিক তার মত দেখা গেলো না।

উল্টো সেমিফাইনালে দাপট দেখালো স্পেন। শুরু থেকেই ছন্দে ছিল তারা। আর সেই ছন্দ শেষ পর্যন্ত ভাঙতে পারেনি ফ্রান্স। কিলিয়ান এমবাপেদের আক্রমণভাগ ছিল নিষ্প্রভ, অন্যদিকে লামিনে ইয়ামাল, দানি ওলমো ও পেদ্রো পোরোদের গতিময় ফুটবলে ২-০ গোলের জয় তুলে নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে ‘লা রোহা’রা।

প্রথমার্ধে খেলার ২১তম মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করে স্পেনকে এগিয়ে দিয়েছিলেন মিকেল ওইয়ারজাবাল। দ্বিতীয়ার্ধে, ম্যাচের ৫৮তম মিনিটে সেই ব্যবধান দ্বিগুণ করেন পেদ্রো পোরো।

শুরু থেকেই দু’দলই উচ্চগতির ফুটবল খেললেও ধীরে ধীরে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেয় স্পেন। নবম মিনিটে দানি ওলমোকে বক্সের ঠিক বাইরে ফাউল করে হলুদ কার্ড দেখেন ফরাসি মিডফিল্ডার আদ্রিয়েন রাবিও। তবে সেই ফ্রি-কিক থেকে কোনো সুবিধা নিতে পারেনি লা রোহারা।

২০ মিনিটে আসে ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট। বাম দিক থেকে মার্ক কুকুরেয়ার উঁচু ক্রস নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করেন ফরাসি ডিফেন্ডার লুকা দিন। কিন্তু বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে লামিনে ইয়ামালকে জোরে লাথি মারেন তিনি। কোনো দ্বিধা না করে স্পট কিকের নির্দেশ দেন রেফারি।

২১ মিনিটে পেনাল্টি নিতে এসে দারুণ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বল জালে জড়িয়ে দেন মিকেল ওইয়ারজাবাল। মাইক মেনিয়াঁ সঠিক দিক অনুমান করলেও স্প্যানিশ ফরোয়ার্ডের জোরালো শট ঠেকাতে পারেননি। চলতি বিশ্বকাপে এই প্রথমবারের মতো পিছিয়ে পড়ে ফ্রান্স।

গোল হজমের পর ম্যাচে ফেরার চেষ্টা চালায় দিদিয়ের দেশমের শিষ্যরা। ১৬ মিনিটে দ্রুতগতির পাল্টা আক্রমণে এমবাপে প্রায় একা গোলমুখে চলে যাচ্ছিলেন, কিন্তু পাও কুবারসি ও আয়মেরিক লাপোর্তে সময়মতো ফিরে এসে বিপদ সামাল দেন।

৪২ মিনিটে ফ্রান্স সমতায় ফেরার সবচেয়ে ভালো সুযোগ তৈরি করে। রাবিওর বাড়ানো বল ধরে এমবাপে স্পেনের রক্ষণ ভেঙে এগিয়ে গেলেও গোলরক্ষক উনাই সিমন দ্রুত বেরিয়ে এসে অসাধারণ দক্ষতায় বল ক্লিয়ার করে দেন।

অন্যদিকে ৩৮ মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করার সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছিল স্পেন। মেনিয়াঁর ভুল পাস থেকে বল পেয়ে দানি ওলমো ব্যাকহিল পাসে ইয়ামালকে সুযোগ করে দেন। ইয়ামালের কাটব্যাক থেকে ফাবিয়ান রুইজ শট নিতে গেলেও শেষ মুহূর্তে দারুণ ব্লক করে দলকে রক্ষা করেন দায়ো উপামেকানো।

প্রথমার্ধে আরেকটি বড় ধাক্কা খায় ফ্রান্স। ২৯ মিনিটে পিঠে চোট পেয়ে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন আর্সেনাল ডিফেন্ডার উইলিয়াম সালিবা। তার পরিবর্তে নামেন ম্যাক্সেন্স লাখ্রোয়া।

স্পেনের রক্ষণও ছিল দুর্দান্ত। বিশেষ করে লাপোর্তে ও কুবারসি একের পর এক আক্রমণ প্রতিহত করে এমবাপে-ওলিসেদের হতাশ করেন। যোগ করা সময়েও রাবিওর পাল্টা আক্রমণ সাহসী হেডে থামিয়ে দেন লাপোর্তে।

৪৫+৬ মিনিটে প্রথমার্ধের শেষ বাঁশি বাজান রেফারি। ওইয়ারজাবালের পেনাল্টি গোলে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকেই বিরতিতে যায় স্পেন। এখন দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচে ফিরতে হলে ফ্রান্সকে আরও আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে হবে, অন্যদিকে এই লিড ধরে রেখে ফাইনালে ওঠার লক্ষ্য থাকবে লা রোহারা।

ম্যাচজুড়ে বলের দখল ও আক্রমণে আধিপত্য বিস্তার করে স্পেন। প্রথমার্ধে এগিয়ে থাকার পর দ্বিতীয়ার্ধে আরও ধারালো হয়ে ওঠে লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল। ৫৮ মিনিটে দানি ওলমোর সঙ্গে দারুণ ওয়ান-টু খেলে বক্সে ঢুকে ঠান্ডা মাথায় গোল করেন রাইটব্যাক পেদ্রো পোরো। মাইক মেনিয়ঁকে পরাস্ত করে স্পেনের ব্যবধান ২-০ করেন তিনি। এই গোলের পরই কার্যত ম্যাচ থেকে ছিটকে পড়ে ফ্রান্স।

গোল হজমের পর পরিবর্তনের ঝড় তোলেন ফরাসি কোচ দিদিয়ের দেশম। ব্র্যাডলি বারকোলার জায়গায় নামানো হয় দেজিরে দুয়েকে। পরে থিও হার্নান্দেজ ও রায়ান শেরকিকেও মাঠে নামানো হয়। তবে কোনো পরিবর্তনই কাঙ্ক্ষিত ফল এনে দিতে পারেনি।

৬১ মিনিটে আবারও জালের দেখা পেয়েছিলেন লামিনে ইয়ামাল। তবে অফসাইডের কারণে সেই গোল বাতিল হয়। এরপরও স্পেনের আক্রমণের ধার কমেনি। ৭৯ মিনিটে আলেক্স বায়েনার ক্রস থেকে ফেরান তোরেসের হেড অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হলে ব্যবধান আরও বাড়ানোর সুযোগ হাতছাড়া হয় স্পেনের।

অন্যদিকে পুরো ম্যাচেই নিজেদের পরিচিত আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে ব্যর্থ হয় ফ্রান্স। ৬৭ মিনিটে এমবাপ্পের শট কুকুরেয়ার গায়ে লেগে কর্নার হলে সেটিই ছিল তাদের অন্যতম সেরা সুযোগ। পরে অরেলিয়েন চুয়ামেনির হেডও লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।

ম্যাচ যত শেষের দিকে গড়িয়েছে, ততই স্পেনের আত্মবিশ্বাস বেড়েছে। ফ্রান্সের খেলোয়াড়দের মধ্যে হতাশা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ৮৬ মিনিটে স্পেনের গোলরক্ষক উনাই সিমনের ওপর দেরিতে ট্যাকল করে হলুদ কার্ড দেখেন এমবাপে।

শেষ দিকে একের পর এক আক্রমণ গড়েও ব্যবধান কমাতে পারেনি ফ্রান্স। ৮৮ মিনিটে ইয়ামালের ফাউলে ফ্রি-কিক পেলেও এমবাপ্পের বাঁকানো শট অনেক উঁচু দিয়ে চলে যায়। ৮৯ মিনিটে ইয়ামাল পেনাল্টির আবেদন করলেও রেফারি তাতে সাড়া দেননি।

অতিরিক্ত সময়ের সাত মিনিটেও ম্যাচে ফেরার মতো কোনো সুযোগ তৈরি করতে পারেনি ফ্রান্স। বরং ৯০+৪ মিনিটে নিকো উইলিয়ামস একক প্রচেষ্টায় বক্সে ঢুকে শট নিলেও বল যায় সাইডনেটে।

স্পেনের রক্ষণভাগ পুরো ম্যাচে ছিল দুর্দান্ত। লাপোর্তে, কুকুরেয়া ও পোরো মিলে এমবাপে-দেম্বেলেদের কার্যত নিষ্ক্রিয় করে রাখেন। ম্যাচজুড়ে ফ্রান্স একবারও গোলরক্ষক উনাই সিমনকে সত্যিকারের পরীক্ষায় ফেলতে পারেনি।

এই জয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠল স্পেন। অন্যদিকে শিরোপার স্বপ্ন ভেঙে বিদায় নিতে হলো এমবাপেদের ফ্রান্সকে।



এএফ/০১