'এইখানে পড়লে মরণ ছাড়া গতি নাই'

বিশ্বজিত রায়, জামালগঞ্জ


সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২০
০৮:০৮ অপরাহ্ন


আপডেট : সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২০
০৮:০৮ অপরাহ্ন



'এইখানে পড়লে মরণ ছাড়া গতি নাই'

'এইখানে পড়লে মরণ ছাড়া গতি নাই। গর্তের ভেতরে চাইলে ভয় করে। গরু-বাছুর এই গর্তে পইড়া আধামরা হইছে। এখন মানুষ মরার বাকি আছে। এইডা জরুরিভিত্তিতে কাজ করা দরকার। গাড়িটাড়ি ঝুঁকি নিয়া চললেও এইডা ঠিক করতে কেউ আগাইয়া আইতাছে না কেনে বুঝতাছি না।'

কথাগুলো বলছিলেন সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার সদর ইউনিয়নের কদমতলী গ্রামের কবিন্দ্র দত্ত। কারণ মৃত্যুকূপে পরিণত হয়েছে সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ-সেলিমগঞ্জ সড়কের মুচিবাড়ি সেতুটি। সাম্প্রতিক বন্যায় সেতুর দুই মুখের মাটি সরে ভয়াবহ গর্তের সৃষ্টি হওয়ায় যেকোনো সময় ঘটতে পারে বড় ধরণের দুর্ঘটনা। গেল কয়েকদিনে সেতুতে ওঠা-নামা করতে গিয়ে গরু-ছাগল গর্তে পড়ে মরণাপন্ন অবস্থায় পতিত হয়েছে। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গর্ত দু'টি বড় আকার ধারণ করলেও সংশ্লিষ্ট মহলের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সেতুতে ওঠা-নামার দুই মুখে কুয়াসদৃশ্য ভয়ঙ্কর গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। একটিতে ভেতরের মাটি সরে গর্তের উপরের অংশের অনেক জায়গা ঠুনকো অবস্থায় পড়ে রয়েছে। যদি পথচারী শিশু-কিশোর দুষ্টুমীর ছলে গর্ত দেখতে সেখানে উঁকি দেয় কিংবা গরু-বাছুর গর্তের পাশ দিয়ে হেঁটে যায়, তাহলে ধসে পড়ে নেমে আসবে ভয়ঙ্কর বিপদ। সেতুর অপর প্রান্তের সম্মুখস্থলে সড়কের প্রায় অর্ধেক অংশ ভেঙে বিশাল খাদে পরিণত হয়েছে।

জামালগঞ্জ-সেলিমগঞ্জ সড়কের নয়াহালট-চাঁনপুরের মধ্যস্থলে অবস্থিত মুচিবাড়ি খালের এ সেতু দিয়েই চরম ঝুঁকি নিয়ে অসংখ্য যান চলাচল করে আসছে। সেতুতে উঠতে গিয়ে অসাবধানতাবশতঃ যাত্রীবাহী কোনো যান যেকোনো সময় গর্তে পড়ে যেতে পারে। ঘটতে পারে বড় ধরণের দুর্ঘটনা। সেতুতে ওঠার আগে এক প্রান্তের গর্ত দূর থেকে আংশিক প্রতীয়মান হলেও সেতুতে ওঠার পর অপর অংশের গর্তটি তেমন চোখে পড়ে না। রাতের বেলায় অসাবধানতাবশ কোনো চালক কিংবা পথচারী এই পথ ধরে এগিয়ে এলে গর্তে পড়ে নিশ্চিত মৃত্যুমুখে পতিত হবেন- এমনটাই জানিয়েছেন কয়েকজন পথচারী।

জানা যায়, হাওরাঞ্চলের দুই জেলা শহর সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনার সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থার অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে এ সড়ক। মোহনগঞ্জ থেকে ধর্মপাশা আর ধর্মপাশা থেকে গজারিয়া, মান্নানঘাট ও জামালগঞ্জ হয়ে নেত্রকোনা-সুনামগঞ্জ সংযোগের এ সড়ক দিয়ে নিয়মিত যাতায়াত করছেন অন্তত অর্ধশতাধিক গ্রামের কয়েক লাখ মানুষ। প্রতিদিন শত শত মোটরসাইকেল, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, পিকআপ, অটোবাইক, অটোরিকশা চলাচল করছে এই রাস্তা দিয়ে। জনগুরুত্বপূর্ণ এ সড়কের নয়াহালট-চাঁনপুর অংশের মুচিবাড়ি সেতুটির প্রবেশমুখের মাটি সরে যে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে, তাতে সম্পূর্ণ ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে যাত্রীবাহী যান ও পথচারীরা। প্রায় মাসখানেক ধরে এ অবস্থার সৃষ্টি হলেও ঝুঁকি নিরসনে সংশ্লিষ্টদের কোনো দায় না থাকায় ক্ষোভ জানিয়েছেন সেতু সংলগ্ন গ্রামের মানুষ।

জামালগঞ্জ সদর ইউনিয়নের চাঁনপুর গজারিয়া হাঁটির মো. আব্দুল হাই ও মো. সাহাদ আলী বলেন, 'সেতুর মুখে যে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে তাতে বিপদ নিশ্চিত। কোনো চালক হঠাৎ না জেনে এ রাস্তা দিয়ে এলে গর্তে পড়ে বড় বিপদের মুখে পড়তে পারেন। কিছুদিন আগে সেতুতে উঠতে গিয়ে একটি গরু গর্তে পড়ে যায়। পরে আশপাশের মানুষ এগিয়ে এসে গরুটিকে অর্ধমৃত অবস্থায় টেনে তোলেন। বেশ কিছুদিন ধরে সেতুর অবস্থা এমন খারাপ হলেও তা সংস্কারে কেউ এগিয়ে আসছে না। এটা খুবই দুঃখজনক।'

সেতু সংলগ্ন নয়াহালট গ্রামের এনামুল হক বলেন, 'সেতুতে উঠতে গিয়া যে গর্তের সৃষ্টি হইছে সেইডা পরিষ্কার মরণফাঁদ। যেকোনো সময় এই গর্তে গাড়ি পইড়া বড় ধরণের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এত গরুত্বপূর্ণ একটা রাস্তার সেতুতে এত বড় গর্ত হইলো, কিন্তু সাধারণ মানুষ ছাড়া অন্য কেউ সেইডা চাইয়া দেখতাছে না।'

উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) সহকারী প্রকৌশলী আনিছুর রহমান বলেন, 'আমরা পানির জন্য কোনো কাজ করতে পারছি না। পানি শুকালে কাজ শুরু হবে। আমি এখন সেখানে যাচ্ছি। আপাতত ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে লাল নিশানা টানিয়ে বিপজ্জনক বলে চিহ্নিত করে দিয়ে আসব।'

এ ব্যাপারে জানতে উপজেলা এলজিইডি প্রকৌশলী আব্দুস সাত্তারের সঙ্গে বার বার যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে তিনি নিজের মোবাইল ফোনটি বন্ধ করে দেন।

 

বিআর/আরআর-১০