নগর এক্সপ্রেস : প্রতিশ্রুতির পর প্রতিশ্রুতি, বাস্তবে অশ্বডিম্ব!

রাফিদ চৌধুরী


সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২০
০১:৩৯ অপরাহ্ন


আপডেট : সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২০
০৮:৪২ অপরাহ্ন



নগর এক্সপ্রেস : প্রতিশ্রুতির পর প্রতিশ্রুতি, বাস্তবে অশ্বডিম্ব!

উন্নত যাত্রীসেবার আশ্বাস দিয়ে নগরের ব্যস্ত সড়কগুলোতে নামানো হয়েছিল ‘নগর এক্সপ্রেস’। বলা হয়েছিল নগর এক্সপ্রেসে থাকবে ওয়াই-ফাই সেবা। নারীদের জন্য থাকবে আলাদা বাস। নারীদের বাসে চালক এবং চালকের সহকারী দুজনই হবেন নারী। নিরাপত্তার জন্য প্রতিটি বাসে থাকবে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা। শিক্ষার্থীদের জন্য থাকবে স্কুল বাস; থাকবে ই-টিকেটিংয়ের ব্যবস্থা। কিন্তু এসব প্রতিশ্রুতির কোনোটিই বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যান্য সাধারণ বাসের মতোই চলছে ‘নগর এক্সপ্রেস’।

গণপরিবহন না থাকায় সিলেটের সাধারণ যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য অনেক ভোগান্তি পোহাতে হতো। জনদুর্ভোগ হ্রাস করার লক্ষ্যে গত ২৬ ডিসেম্বর থেকে সিলেটের সড়কে ‘নগর এক্সপ্রেস’ বাস সার্ভিস শুরু হয়। ৪১টি বাস চালুর কথা থাকলেও প্রাথমিকভাবে ২১টি বাস নিয়ে এই সেবা চালু হয়। পরে চাহিদা বুঝে বাসের সংখ্যা বাড়ানো হবে বলে জানানো হয়েছিল। নিটল টাটা গ্রুপ পরে ২০টি বাস পাঠালেও সেগুলো ফিরিয়ে দেন বাস মালিক পক্ষ। ফলে ২১টি বাসই থেকে যায় এই পরিষেবায়। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ কিছুটা কমার পর পরিবহন চলাচলে বিধি নিষেধ শিথিল করা হলেও এখনও নগর এক্সপ্রেসের প্রতিশ্রুত সবগুলো বাস সড়কে নামানো হয়নি। এখন চলছে মাত্র ১১ থেকে ১২টি বাস।

‘নগর এক্সপ্রেস’ সিটি বাস মালিক গ্রুপের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, আশ্বাস অনুযায়ী এই পরিষেবার বাসগুলোতে সিসি ক্যামেরা চালুর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। পরীক্ষামূলকভাবে তিনটি বাসে যুক্তও করা হয়েছিল সিসি ক্যামেরা। কিন্তু করোনা মহামারির কারণে বাস সেবা বন্ধ হয়ে যায়। গণপরিবহন চলাচলের সিদ্ধান্ত হলে বাসে গিয়ে দেখা যায় রেকর্ডারসহ সিসি ক্যামেরা উধাও। সেসব সিসি ক্যামেরা আর খুঁজেই পাওয়া যায়নি।

যদিও নগর এক্সপ্রেস সিটি বাস মালিক গ্রুপের আহ্বায়ক, সিলেট সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর মখলিছুর রহমান কামরান জানিয়েছেন- এখনও কোনো বাসে সিসি ক্যামেরা যুক্ত করা হয়নি। তিনি সিলেট মিররকে বলেন, ‘সিসি ক্যামেরা যুক্ত করার পরিকল্পনা ছিল আমাদের। তবে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে এখনও সেগুলো যুক্ত করা হয়নি।’

নারী বাসচালক ও সহকারীসহ নারীদের জন্য আলাদা বাস চালুর প্রতিশ্রুতির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘নারীদের জন্য আলাদা একটি বাস চালু আছে। তবে নারী চালক এখনও নিযুক্ত করা হয়নি। আমরা একজনকে প্রশিক্ষণে পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু করোনার কারণে সেই প্রশিক্ষণও বন্ধ হয়ে যায়। তাই পুরুষ চালক ও সহকারী দিয়েই বাস পরিচালনা করা হচ্ছে।’

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিটি বাস মালিক গ্রুপের দায়িত্বশীল এক ব্যক্তি বলেন, ‘নারী চালক হতে আগ্রহী প্রার্থীদের সিভি আমরা খুব বেশি পাইনি। যাদের পেয়েছি তাঁরা খুব একটা অভিজ্ঞতাসম্পন্ন নন। তাই আমরা কোনো ঝুঁকি নেইনি। বাসটা শুধু নারীদের জন্য রেখে চালক ও সহকারী পুরুষই নিয়েছি।’

কয়েকটি বাস ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে মালিক গ্রুপের আহ্বায়ক মখলিছুর রহমান কামরান বলেন, ‘গাড়িগুলো মালিক পক্ষের কারোরই পছন্দ হয়নি। কারণ সেগুলো প্রত্যাশানুযায়ী উন্নতমানের নয়। তাই সেগুলো ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে করে আমাদের কিস্তির চাপ কিছুটা কমেছে। তাই বাকি টাকা ই-টিকেটিং প্রক্রিয়া বাস্তবায়নসহ বাসগুলোকে আধুনিকায়নের কাজে ব্যয় করা হবে।’

করোনার কারণে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা যায়নি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরু না হলে ইতোমধ্যে অনেক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করে ফেলতাম। করোনার কারণে কোনো কিছুই সম্ভব হয়নি।’

সবগুলো বাসে ওয়াই-ফাই সুবিধা থাকবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন নগর এক্সপ্রেসের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো বাসেই এই সেবা চালু করা হয়নি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে কামরান বলেন, ‘সিলেটের সব ব্রডব্যান্ড কোম্পানির সঙ্গে আমরা কথা বলেছি। কিন্তু বাসে ওয়াই-ফাই সেবা দেওয়ার মতো সক্ষমতা এখনও কারো হয়নি। তাই আমরা বিকল্প মাধ্যম খুঁজছি। যাদের নেটওয়ার্ক সক্ষমতা সব জায়গায় রয়েছে, তাদেরকেই আমরা বেছে নেব।’

‘নগর এক্সপ্রেস’ বাসের নেই নিজস্ব কোনো স্ট্যান্ডও। যত্রতত্র রাখা হয় বাসগুলো। কিছু বাস রাখা হয় সুরমা নদীর পাড়ে, কিছু রাখা হয় পারাইরচকের কেন্দ্রীয় ট্রাক টার্মিনালে। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মালিক গ্রুপের আহ্বায়ক বলেন, ‘৯ নম্বর ওয়ার্ডে একটি জায়গা নির্ধারণ করেছিলাম। কিন্তু সেই জায়গা নিয়ে মামলা হয়ে যাওয়ায় আমরা সরে এসেছি। এখন অন্যত্র জায়গার খোঁজ চলছে।’

উন্নত যাত্রীসেবার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে ঠিক উল্টোটি ঘটছে বলে অভিযোগ করছেন অনেকে। তাদের অভিযোগ বাস চালক ও সহকারীরা যাত্রীদের সঙ্গে অসদাচরণ করেন। বেপরোয়া গতিতে বাস চালানোরও অভিযোগ রয়েছে।

নগরের মিরাবাজার এলাকার ব্যবসায়ী আলম মিয়া সিলেট মিররকে বলেন, ‘আমার দোকানের সামনে অনেক যাত্রী উঠানামা করেন। চালক এবং সহকারীরা প্রায়ই অতিরিক্ত ভাড়া আদায় নিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে অসদাচরণ করেন। তাঁরা যাত্রীদের হুমকি পর্যন্ত দেয়। এছাড়া বাস চালকের সহকারী হিসেবে যাদের রাখা হয়েছে তাদের বেশিরভাগকেই অপ্রাপ্ত বয়স্ক বলে মনে হচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাস মালিক গ্রুপের আহ্বায়ক মখলিছুর রহমান কামরান বলেন, ‘অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের কোনো সুযোগ নেই। কারণ টিকেট ছাড়া বাস চড়ার নিয়ম নেই। তবে অনেক সময় বাসের সহকারীরা টিকেট দেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ধরনের অভিযোগ আমাদের কাছে আগেও এসেছে। টিকেট না দিলে যাত্রীরা বিনা ভাড়াতেই বাসে চড়বেন।’ এ সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে সঙ্গে সঙ্গে চালক ও সহকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।

আরসি/এনপি/বিএ-০৯