বিয়ের দাবিতে তরুণীর ১৯ ঘন্টা অনশন, অতঃপর হাসপাতালে

এ.জে লাভলু, বড়লেখা


জুলাই ০২, ২০২০
১০:৩৬ অপরাহ্ন


আপডেট : জুলাই ০২, ২০২০
১০:৩৬ অপরাহ্ন



বিয়ের দাবিতে তরুণীর ১৯ ঘন্টা অনশন, অতঃপর হাসপাতালে

হাসপাতালে ভর্তি নাজমিন বেগম

দু'জনের বাড়ি একই ইউনিয়নে। বাড়িতে যাওয়া-আসার সুবাদে তরুণীর সঙ্গে পরিচয় হয় তরুণের। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে গভীর প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। প্রেমিক কথা দিয়েছিলেন প্রেমিকাকে বিয়ে করে ঘরে তুলবেন। প্রেমিকের আশ্বাস পেয়ে প্রেমিকা তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কেও জড়িয়েছিলেন।

কিন্তু শেষমেষ কথা রাখেননি প্রেমিক। উল্টো এখন শারীরিক সম্পর্কের কথা অস্বীকার করে প্রেমিকা ও তার বাবাকে হুমকি দিচ্ছেন। ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহল উঠেপড়ে লেগেছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। তাই বাধ্য হয়ে প্রেমিকা বিয়ের দাবিতে প্রেমিকের বাড়িতে অনশন শুরু করেন। টানা ১৯ ঘন্টা অনশন করে প্রেমিকের বাড়িতেই অসুস্থ হয়ে পড়েন প্রেমিকা। অনশনকালে প্রেমিকের পরিবার তাকে নির্যাতন করেছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। 

মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার মুর্শিবাদকুরা গ্রামে এ ঘটনা ঘটেছে। গতকাল বুধবার (১ জুলাই) বিকেল ৩টা থেকে আজ বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) সকাল ৯টা পর্যন্ত প্রেমিকের বাড়িতে টানা ১৯ ঘন্টা অনশন করে অসুস্থ হয়ে পড়েন প্রেমিকা নাজমিন বেগম (১৮)। বৃহস্পতিবার সকালে স্থানীয় লোকজন ও গ্রাম পুলিশ তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন। এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার বিকেলে প্রেমিকা নাজমিন বেগম প্রেমিক কালন মিয়াসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দিয়েছেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার তালিমপুর ইউনিয়নের মুর্শিবাদকুরা গ্রামের আলা উদ্দিনের ছেলে কালন মিয়া প্রায়ই পাশের খুটাউরা গ্রামের তাজ উদ্দিনের বাড়িতে যাওয়া-আসা করতেন। সেই সুবাদে তাজ উদ্দিনের মেয়ে নাজমিন বেগমের সঙ্গে প্রায় ৬-৭ মাস পূর্বে তার পরিচয় হয়। এরপর থেকে কালন মিয়া নাজমিনের বাবার মুঠোফোনে কল দিয়ে তার সঙ্গে কথা বলতেন। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে গভীর প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

গত ৩১ মার্চ নাজমিনের বাবা-মা বাড়িতে ছিলেন না। এই সুযোগে রাতে কালন বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে নাজমিনের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করেন। এরপর থেকে মেয়েটি বিয়ের জন্য কালনকে চাপ দিলে তিনি নানা টালবাহানা শুরু করেন। একপর্যায়ে তিনি নাজমিনকে বিয়ে করবেন না বলে জানিয়ে দেন। পরে নাজমিন বিষয়টি তার বাবা-মাকে জানালে তারা বিষয়টি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ এলাকার লোকজনকে জানান। এরপর তারা বিষয়টি নিষ্পত্তির আশ্বাস দেন।

গত ১৫ মে দুই পরিবারের অভিভাবক, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ এলাকার লোকজন সালিস বৈঠকে বসেন। বৈঠক শেষে সিদ্ধান্ত হয়, প্রেমিক কালন নাজমিনকে স্ত্রী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ঘরে তুলে নেবেন। এরপর দুইদিন সময় চেয়ে নেন কালন মিয়া ও তার পরিবার। পরে স্থানীয় প্রভাবশালীদের ইন্ধনে কালন মিয়া ও তার পরিবার নানা টালবাহানা শুরু করে। উল্টো নাজমিন ও তার বাবাকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। এ অবস্থায় ন্যায়বিচার চেয়ে গত ৮ জুন নাজমিন বেগম তালিমপুর ইউনিয়ন গ্রাম আদালতে লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৪ জুন তালিমপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান দুইপক্ষের লোকজনকে ডেকে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করেন। কিন্তু কালনের পরিবার না মানায় শেষ পর্যন্ত সমস্যার সমাধান হয়নি। তাই বাধ্য হয়ে নাজমিন গতকাল বুধবার বিকেলে ৩টায় প্রেমিক কালন মিয়ার বাড়িতে গিয়ে অবস্থান নেন।

আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে হাসপাতালে ভর্তি নাজমিন বেগম বলেন, 'কালনের সঙ্গে দীর্ঘদিন থেকে আমার প্রেমের সর্ম্পক রয়েছে। সে আমাকে বিয়ে করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আমার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করেছে। আমি বিয়ের জন্য চাপ দেওয়ায় সে নানা টালবাহানা শুরু করেছে। গ্রাম পঞ্চায়েতের সিদ্ধান্ত মেনে নিলেও পরে বিয়েতে রাজি হয়নি। শারীরিক সম্পর্কের বিষয়টিও এখন অস্বীকার করছে। তাই আমি বাধ্য হয়ে তার (কালন) বাড়িতে অবস্থান করেছি। তার আত্মীয়-স্বজন আমাকে মারধর করেছেন। তার বাড়ি থেকে বের করে দিতে চেয়েছেন। মেরে ফেলার হুমকিও দিচ্ছেন। এখন যদি সে (কালন) আমাকে বিয়ে না করে তবে আমি তার বাড়িতেই আত্মহত্যা করব।'

তালিমপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বিদ্যুৎ কান্তি দাস বলেন, 'উভয়পক্ষের কথা শুনে বিষয়টি মীমাংসার উদ্যোগ নিয়েছিলাম। বিষয়টি আপসে মীমাংসা করার জন্য উভয়পক্ষই রাজি হন। কালন মিয়া নাজমিনকে স্ত্রী হিসেবে মর্যাদা দেবেন বলে তিনদিন সময় নেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কালনের পরিবার না মানায় তা আর সমাধান হয়নি। বুধবার বিয়ের দাবিতে প্রেমিকের বাড়িতে নাজমিনের অবস্থানের ও আত্মহত্যার হুমকির খবর পেয়ে রাতে তিনি দুইজন গ্রাম পুলিশ পাঠিয়ে পাহারা দিয়েছি, যাতে মেয়েটি কোনো দুর্ঘটনা না ঘটায়। আজ সকালে অজ্ঞান হয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শুনেছি নাজমিন বেগম এ ব্যাপারে থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছে।'

এ ব্যাপারে বড়লেখা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইয়াছিনুল হক বৃহস্পতিবার বিকেলে বলেন, 'ঘটনাটি তদন্তপূর্বক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'

 

এজে/আরআর-০৮