‘সম্প্রীতির সিলেট’ গড়ার অঙ্গীকার

সিলেট মিরর ডেস্ক


জানুয়ারি ২৮, ২০২৬
০৩:৩২ পূর্বাহ্ন


আপডেট : জানুয়ারি ২৮, ২০২৬
০৩:৪৪ পূর্বাহ্ন



‘সম্প্রীতির সিলেট’ গড়ার অঙ্গীকার
প্রার্থীদের নিয়ে নির্বাচনী সংলাপে


নির্বাচনী প্রচারে ব্যস্ত সবাই। সিলেট জেলার ছয়টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ৩৩ জন প্রার্থী। নিজেকে যোগ্য প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরে দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি। এমন কী প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থীকে নিয়ে দলীয়ভাবে সমালোচনা করছেন। কিন্তু যখনই কোথায় তাদের দেখা হয় তখন একে অপরকে জড়িয়ে ধরে সম্প্রীতির বার্তা দেন। 

গতকাল মঙ্গলবার এই চিত্র আকারও দেখা গেল একটি নির্বাচনী সংলাপে। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সঙ্গে দেখা হওয়া মাত্র কোলাকুলি করলেন সবাই। তাদের বক্তব্যে জানালেন, জয়-পরাজয় বড় কথা নয়-সবাই মিলেই গড়বেন সম্প্রীতির সিলেট।

গতকাল মঙ্গলবার বেলা ১১টায় সিলেট শহরতলির বিমানবন্দর এলাকার পাঁচ তারকা গ্র্যান্ড সিলেট হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টে আয়োজিত এক নির্বাচনী সংলাপে এমন দৃশ্য দেখা যায়। প্রথম আলো ও ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের উদ্যোগে ‘সহিংসতা নয়, গড়ি সম্প্রীতির সিলেট’ শীর্ষক এ সংলাপ চলে বেলা ১টা ২২ মিনিট পর্যন্ত।

সংলাপ শুরুর আগেই বিভিন্ন আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) প্রার্থীরা অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত হন। তাঁরা কোলাকুলি ও খোশগল্পে মেতে ওঠেন। প্রার্থীদের এমন সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের নজর কাড়ে এবং তাঁরা এর প্রশংসা করেন।



সিলেটে এক নির্বাচনী সংলাপে দেখা হতেই একে অপরের সঙ্গে কোলাকুলি করেন সিলেট-১ আসনের দুইপ্রার্থী খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর ও মাওলানা হাবিবুর রহমান। 



অনুষ্ঠানস্থলে এসে সিলেট-১ (মহানগর ও সদর) আসনে বিএনপির প্রার্থী খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হাবিবুর রহমান একে অপরের সঙ্গে কোলাকুলি করেন। একইভাবে সিলেট-৪ (কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুর) আসনে বিএনপির প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী জয়নাল আবেদীন সৌহার্দ্য বিনিময় করেন। এ ছাড়া সিলেট-১ আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মাহমুদুল হাসান ও সিপিবির প্রার্থী মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেনও কুশল বিনিময় করেন।

সংলাপটি সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী। এতে বক্তব্য দেন সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী, মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি সিলেটের উপাচার্য মোহাম্মদ জহিরুল হক, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সিলেট মহানগরের সাধারণ সম্পাদক কিবরিয়া সরওয়ার, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের সভাপতি সৈয়দা শিরিন আক্তার, সিলেট জেলা কর আইনজীবী সমিতির সভাপতি সমর বিজয় সী শেখর, সিলেট মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক আবদুর রহমান, সিলেট উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি লুবানা ইয়াছমিন, সংক্ষুব্ধ নাগরিক আন্দোলন সিলেটের সমন্বয়ক আবদুল করিম চৌধুরী ও শিক্ষক সাইদুর রহমান।

বক্তারা বলেন, দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় সিলেট সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সম্প্রীতির একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। এই সম্প্রীতি ভবিষ্যতেও ধরে রাখতে হবে। নির্বাচনের আগে ও পরে যেন কোনো ধরনের সহিংসতা না ঘটে, সেই দায়িত্ব রাজনৈতিক নেতাদেরই নিতে হবে।

সংলাপে চা-শ্রমিক ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানবেতর জীবনযাপন, যোগাযোগ-সংকট নিরসন, শিল্পায়নের বিস্তার, সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার, পর্যটন এলাকার উন্নয়ন ও সিলেট অঞ্চলের উন্নয়ন বৈষম্য দূর করার বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে আলোচিত হয়।

সিলেট-১ (মহানগর ও সদর) আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য প্রার্থী ও বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর বলেন, আগামী দিনে প্রথম যে জিনিস অর্জন করা প্রয়োজন, সেটি হচ্ছে স্থিতিশীলতা। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরে দেশের সব রাজনৈতিক দল অন্তত এক মতে উপনীত হতে পেরেছেন যে, নির্বাচনকেন্দ্রিক বা ক্ষমতার পালাবদল এই সমস্ত ইস্যুকে কেন্দ্র করে দেশে আর একটা রাজনৈতিক বিভেদ দেশের জন্য অ্যাফর্টেবল না। এ জন্য সবাই একমত হয়েছেন, জাতীয় নির্বাচনগুলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হবে। একইভাবে এক ব্যক্তি দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী হবেন না। দেশে ধর্ম, বর্ণ কিংবা আর কোনো ভিত্তিতে আমরা বিভেদ চাই না।

সিলেট-১ আসনে জামায়াতের প্রার্থী ও জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা হাবিবুর রহমান বলেন, সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য বিশেষ করে বড় দুই দল বিএনপি ও জমায়াতের সম্প্রীতি থাকলে সারা সিলেটে সম্প্রীতি থাকবে। এজন্য দুই দলকেই দায়িত্ব নিতে হবে। পাশাপাশি তরুণদের ভাষা বুঝতে হবে। তাঁদের ভাষা বুঝতে না পারলে আমরা বড় ভুল করব। যারা তরুণ রয়েছেন, তাঁরাই বলছেন একাত্তরের চেতনাকে বাদ দেওয়া যাবে না। যদিও তাঁরা ১৯৭১ দেখেনি, জুলাই দেখেছে। এ সময় তিনি জামায়াত ক্ষমতায় গেলে বৈষম্যহীন, সন্ত্রাসমুক্ত, চাঁদাবাজিমুক্ত ও দুর্নীতিমুক্ত দেশ উপহার দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন। 

সিলেটকে ‘সম্প্রীতির বিভাগ’ বলা হয় জানিয়ে সিলেট-৪ (কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুর) আসনে ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী ও জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মো. জয়নাল আবেদীন বলেন, সিলেটের মানুষকে দীর্ঘ দিনের চাওয়া-পাওয়া নিয়ে আন্দোলন, লড়াই-সংগ্রাম করতে হয়েছে। সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় নামকরণ প্রতিষ্ঠা, সিলেট বিভাগের জন্য আন্দোলন করতে হয়েছে। কিন্তু সিলেটের সঙ্গে বৈষম্য করা হয়েছে, হচ্ছে। এখানে গ্রামীণ সড়কে একটি বাস ট্রাক গেলে অন্য গাড়ি চলতে পারে না। এ ছাড়া হাওর উন্নয়নে কোনো পরিকল্পনা নেই। সিলেটের মতো বন্যাদুর্গত এলাকায় উদ্ধার কিংবা শেল্টারের জন্য ব্যবস্থাও নেই। 


সিলেটে এক নির্বাচনী সংলাপে দেখা হতেই একে অপরের সঙ্গে কোলাকুলি করেন সিলেট-৪ আসনের দুইপ্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী ও জয়নাল আবেদীন। 


সিলেট-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী, সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আরিফুল হক চৌধুরী সম্প্রীতি ও সহিংসতামুক্ত এলাকা হিসেবে সিলেট দৃষ্টান্ত দেখিয়ে আসছে বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, সিলেটের পর্যটন এলাকা নিয়ে মহাপরিকল্পনা প্রয়োজন। এ সময় তিনি তাঁর বক্তব্যে তাঁর নির্বাচনী এলাকার কেন্দ্রগুলোতে ভোটারদের যাতায়াতে অসুবিধার কথা তুলে ধরে দ্রুত সমাধানের দাবি জানান। এ ছাড়া তাঁর নির্বাচনী এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, চিকিৎসা কেন্দ্রের অভাবের কথা জানিয়ে নির্বাচিত হলে এসব ক্ষেত্রে এক বছরের মধ্যে উন্নতি ঘটানো হবে বলেও প্রতিশ্রুতি দেন।

সিলেট-১ আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মাহমুদুল হাসান বলেন, সিলেটে সবসময় দেখি সব দলের নেতারা সম্প্রীতি বজায় রাখার চেষ্টা করেন। একটি পরিবারের মতো সবাই থাকার চেষ্টা করেন। নির্বাচনের সময় কোনো সহিংসতা হলে প্রার্থীদের উপরই কালিমা আসে। এখানে বড় দলগুলোর দায়িত্ব বেশি থাকে। তাঁরা চেষ্টা করলে সেটি শূন্য শতাংশে নামিয়ে আনা কোনো ব্যাপার নয়, বিশেষ করে সিলেটের ক্ষেত্রে। সিলেটে এক প্রার্থী অন্য প্রার্থীর বিরোধীতা করলেও এমন শব্দ ব্যবহার করেন না, যেগুলো শুনতে খারাপ। এ সময় তিনি উন্নয়নের ক্ষেত্রে সিলেট চরম বৈষ্যম্যের শিকার হচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেছেন। 

সিলেটে সম্প্রীতির বন্ধন আছে, সহিংসতা আছে, কিন্তু বিভিন্ন সময় উসকে দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) সিলেটের সিলেট-১ আসনের প্রার্থী মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, ২০১৪ সালে নির্বাচনের আগে সিপিবির নির্বাচনী সমাবেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে বিভাগীয় সমাবেশে হামলা করা হয়েছিল। পরবর্তীসময়েও এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। সাম্প্রতিক সময়েও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। এসবের পরও সম্প্রীতির বন্ধন টিকে আছে। সম্প্রতি বিভিন্ন মাজারে হামলা হয়েছে। কিন্তু এটি সিলেটের রীতির মধ্যে পড়ে না।


সিলেটে গতকাল মঙ্গলবার আয়োজিত এক নির্বাচনী সংলাপে উপস্থিতদের একাংশ।


সিলেট জেলার ৬টি সংসদীয় আসনে বিএনপি ও তাঁদের সমর্থিত প্রার্থীদের নির্বাচনী সমন্বয়কের দায়িত্ব পেয়েছেন জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী। তিনি বক্তব্যে বলেন, বিগত ১৭ বছরে দেশে কোনো কাক্সিক্ষত উন্নয়ন হয়নি। গত ৫ বছর ধরে সিলেট-ঢাকা মহসাড়কের কাজ হচ্ছে জানানো হলেও উল্লেখযোগ্য অংশ এখনো শেষ হয়নি। সিলেট সর্বোচ্চ ট্যাক্স পেয়ার হলেও উন্নয়ন বঞ্চিত। বিএনপি ক্ষমতায় গেলে সিলেটসহ দেশকে পুনর্গঠন করা হবে। প্রতিটি অঞ্চলে যেন উন্নয়ন হয়, বিষয়গুলো নিয়ে স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে।

জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী আরও বলেন, সারা দেশে সুষম উন্নয়নের ব্যাপারে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিভিন্ন জনসভায় বলছেন। বাকিগুলো আমাদের ইশতেহারে চলে আসবে। সিলেটে বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও আর্থ সামাজিক বিষয়ে পিছিয়ে আছে, সেগুলো গুরুত্ব দেওয়া হবে। নির্বাচনকেন্দ্রিক সন্ত্রাস যাতে না হয়, সেটি বন্ধ করতে প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করা হচ্ছে। এর বাইরে সিলেটের মাদক সমস্যা, কিশোর গ্যাং, চুরি, ছিনতাই, জুয়া নিয়ন্ত্রণ এবং মানুষ যেগুলো অপছন্দ করে, সেসব দমনে কাজ করবে বিএনপি।

মেট্রোপলিটন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মোহাম্মদ জহিরুল হক বলেন, এইবারের নির্বাচন হবে কি না, এ নিয়ে অনেকে এখনো সংশয় প্রকাশ করছেন। সবাই এখন নির্বাচনমুখী হলেও অনেকের সংশয় দূর হচ্ছে না। আর বড় দুটি দল বিএনপি ও জামায়াতের নেতৃত্বে নির্বাচন হচ্ছে। এই দুই দল থেকেই সরকার এবং বিরোধীদল হবে। দুই দলের আচরণে বোঝা যাচ্ছে, হারলে সব কিছু শেষ। বিএনপি মনে করছে এইবারের নির্বাচনে হেরে গেলে আর দাঁড়াতে পারব না, ভবিষ্যত শেষ। অন্যদিকে জামায়াত মনে করছে, এবারের সুযোগ যদি চলে যায় এত নির্যাতন-নিপীড়নের পর দাঁড়িয়েছিলাম আর মনে হয় দেশে থাকতে পারব না। এই আশঙ্কা নিয়েই নির্বাচন হচ্ছে।

মোহাম্মদ জহিরুল হক আরও বলেন, নির্বাচনে সহিংসতার আশঙ্কা বাদ দিতে পারি না। সিলেটের মানচিত্র লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, এক তৃতীয়াংশ সীমান্ত এলাকা। সিলেটের প্রধান দুটি রাজনৈতিক আসন সীমান্ত এলাকায়। যার কারণে নির্বাচনী সহিংসতার বাইরে আমরা সিলেকে রাখতে পারি না। 

সংক্ষুব্ধ নাগরিক আন্দোলন সিলেটের সমন্বয়ক আবদুল করিম চৌধুরী কিম তাঁর বক্তব্যে প্রথম আলোতে প্রকাশিত একটি সংবাদের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘প্রশাসনিক পুনবিন্যাস সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটিতে একটি সিদ্ধান্ত হয়েছে। সিদ্ধান্তটি হচ্ছে ৬৪টি জেলাকে তিনটি গ্রেডে ভাগ করা হয়েছে। সিলেট জেলা এত দিন “এ” গ্রেডে ছিল। সেই সংবাদে ছয়টি জেলাকে বিশেষ শ্রেণি করা হয়েছে। সেই ছয়টি জেলা ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, ময়মনসিংহ এবং গাজীপুর। এইসব জেলাগুলোতে বিভিন্নভাবে উন্নয়ন পরিকল্পনা করা হবে। সরকারি দপ্তরগুলোতে লোকবল ও বাজেট বাড়ানো হবে। সিলেটকে বাইরে রেখে বিশেষ জেলা করা হয়েছে, সেটি সংক্ষুব্ধ হওয়ার মতো ঘটনা। সিলেট যখনই বঞ্চিত হয়, সিলেটের রাজনীতিবিদরা সকল দলমতের উর্ধ্বে ওঠে একত্রিত হন।’ 

জাতীয় নাগরিক কমিটি (এনসিপি) সিলেট মহানগরের সদস্যসচিব কিবরিয়া সরওয়ার বলেন, ২০২৪ সালের আগস্ট পরবর্তী সময়ে দেশ পরিচালনার জন্য যে অন্তবর্তীকালীন সরকারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তারা কতটুকু সফল হয়েছে, সেটি বিবেচনা করবেন জনসাধারণ। যে জায়গায় ওসমান হাদিকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে, সেখানে আইনের শাসন কতটুকু প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেটি বিচারের দায়ভার জনগণের। মূলত পাওয়ার প্র্যাকটিসের কারণে সহনশীলতা কমে সহিংসতা বেড়ে যায়। এর পেছনের কারণ ক্ষমতায় যাওয়ার লোভ। এ ক্ষেত্রে অনেকে বিবেক বুদ্ধি হারিয়ে ফেলেন। এসব দূর করতে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, গুজব চিহ্নিত করা এবং নিজের পর্যালোচনা করার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। 

মেট্রোপলিটন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সাইদুর রহমান নির্বাচনী সংলাপের বিষয় হিসেবে ‘সহিংসতা’ বিষয়টিকে সামনে না এনে ‘সম্প্রীতির’ কথাটি সামনে রাখলে ভালো হতো বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, সিলেট বরাবরই সম্প্রীতির এলাকা। 

নির্বাচনের সময় পেশীশক্তির ব্যবহার হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের সভাপতি সৈয়দা শিরিন আক্তার। তিনি বলেন, গত ৫ আগস্ট সিলেটের অনেক থানা থেকে অস্ত্র লুট হয়েছে। সেগুলো উদ্ধার না হওয়ায় নির্বাচনের সময়ে ব্যবহার হতে পারে, এমনটি আশঙ্কা রয়েছে। সিলেটে নৃতাত্বিক জনগোষ্ঠী, চা-শ্রমিক, প্রান্তিক নারীরা রয়েছেন। নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর লোকজন আওয়ামী লীগের সমর্থক, নির্বাচনে তাঁরা নৌকা ভোট দেন, এমন একটা কথা প্রচার আছে। এখন আওয়ামী লীগ না থাকায় অন্য বড় দুটি দল তাঁদের প্রেসার দিচ্ছে কি না, সেটি দেখার বিষয়। নির্বাচনের আগে কিংবা পরে যাতে তাঁরা হামলার শিকার না হন, সেটি রাজনৈতিক দলগুলোকেই দেখতে হবে।

সিলেট মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক আবদুর রহমান রিপন বলেন, ব্যবসায়ীরা শান্তিতে ব্যবসা করতে চাই। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরবর্তী সময়ে ব্যবসায়ীরা মনে করেছিলেন দেশে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে। কিন্তু আমরা দেখছি আবার পরিস্থিতি আগের জায়গায় ফিরে গেছে। ব্যবসার ক্ষেত্রে ট্যাক্স, ভ্যাটের ঝামেলা দেখা দিয়েছে। রাজনীতিবিদরা হিংসা-প্রতিহিংসা থেকে বের হয়ে আসতে না পারলে দেশকে সুন্দরভাবে গড়ে তোলা যাবে না। 

সিলেট জেলা কর আইনজীবী সমিতির সভাপতি সমর বিজয় সী শেখর বলেন, সিলেটে আদিবাসী, প্রান্তিক নৃগোষ্ঠীর বাসিন্দা রয়েছেন। বিভিন্ন স্থানীয় কিংবা জাতীয় নির্বাচনের পর দেখা গেছে প্রান্তিক জনগোষ্ঠির ওপর অত্যাচার হয়েছে। অমুককে ভোট না দেওয়ায় অত্যাচার হয়েছে। তাই রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে সিলেটের সম্প্রীতির বিষয়গুলো ব্যাপকভাবে আনতে হবে। 

নারীদের ক্ষমতায়ন বাড়াতে রাজনৈতিক দলগুলোর আরও উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান সিলেট উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি লুবনা ইয়াছমিন। তিনি বলেন,  নারীদের উপরে উঠতে বাধা সৃষ্টি করা হয়। যে উপরে উঠতে চায়, তাঁর বিরুদ্ধে রিউমার ছড়ানো হয়। নারীদের নিরাপত্তা দেওয়া শুধু যাঁরা নির্বাচিত হবেন তাঁরা নন, যাঁরা প্রার্থী হয়েছেন তাঁদেরও দায়িত্ব। 

অনুষ্ঠানের শেষাংশে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল সিলেটের জ্যেষ্ঠ আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক আসমা আক্তার। এ ছাড়া প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি আনোয়ার হোসেন ও সিলেটের নিজস্ব প্রতিবেদক সুমনকুমার দাশ বক্তব্য দেন।

ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল সিলেটের জ্যেষ্ঠ আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক আসমা আক্তার বক্তব্যে বলেন, ‘আসুন, আমরা দেশটাকে ভালোবাসি, দেশের মানুষের কথা চিন্তা করি। নিজেরটা একটু পরে ভাবি। আসলে এর উল্টোটা হয়ে যায়। কিন্তু একটাই অনুরোধ সবার কাছে, সম্প্রীতির বাংলাদেশটা আমরা সব জায়গায় দেখতে চাই এবং এটাই আশা করি। এর প্রত্যাশাটা একজন মানুষ হিসেবে করতে পারি, এটা দোষের কিছু না।’



এএফ/০১