সিলেটের সংস্কৃতির সূর্য কখনও অস্ত যায় না

নিজস্ব প্রতিবেদক


মে ২৬, ২০২৪
১১:৫৫ অপরাহ্ন


আপডেট : মে ২৮, ২০২৪
০১:২৮ পূর্বাহ্ন



সিলেটের সংস্কৃতির সূর্য কখনও অস্ত যায় না
নগরে অতিথি


নাসির আলী মামুন। বাংলাদেশে পোর্ট্রেট ছবির জনক। কবি শামসুর রাহমান তাঁকে ‘ক্যামেরার কবি’ বলে অভিহিত করেছিলেন। কবি আল মাহমুদও একইভাবে অভিহিত করেছিলেন। এই দুইজনের সঙ্গেঁ তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। কিন্তু দুই কবির দূরত্ব ছিল প্রকট। অথচ এই দুজনকে একত্র করার অসাধ্য সাধন করতে পেরেছিলৈন নাসির আলী মামুন। কবি নির্মলেন্দু গুণের ভাষায় নাসির আলী মামুন ‘আলোছায়ার কবি।’

সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন নোবেলজয়ী লেখক গুন্টার গ্রাস, মাদার তেরেসা, আলেন্স গিন্সবার্গ, মাওলানা ভাসীরন ছবি যেমন তুলেছেন তেমনি তুলেছেন ছিন্নমূল মানুষের মুখছবি। নিয়েছেন সাক্ষাৎকার। ‘ঘর নাই’ নামে এ রকম একটি বইও আছে তাঁর। এখন তার বড় স্বপ্ন-ফটোগ্রাফি বিষয়ক মিউজিয়াম ‘ফটোজিয়াম’ গড়ে তোলা, সেই প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেনও। 

‘ক্যামেরার কবি’ নাসির আলী মামুন দীর্ঘ ২২ বছর পর গতকাল সিলেট এসেছিলেন। তাঁকে নিয়ে নির্মাতা মকবুল চৌধুরী নির্মিত ডকুমেন্টারি    ‘নাসির আলী মামুন ইন প্রেইজ অফ শ্যাডোজ’-এর প্রদর্শনী অনুষ্ঠানে। অনুষ্ঠান শেষে চলে আসেন সিলেট মিরর-কার্যালয়ে। অনেক স্মৃতিচারণ। সিলেট প্রসঙ্গ তো বটেই, ফটোগ্রাফি নিয়েও। ফটোগ্রাফিতে তাঁর পথচলা, নানা অভিজ্ঞতা, এমনকি শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদের দ্বৈরথের স্মৃতিচারণও। 

সিলেট মিরর সম্পাদকের সঙ্গে কত কথা-কত স্মৃতি। অনেক কথা থেকে চুম্বক অংশ পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো-


সিলেট মিরর: ফটোগ্রাফির শুরুটা কীভাবে?

নাসির আলী মামুন: একেবারে ছোটবেলা থেকে। আমাদের বাসা ও প্রতিবেশীদের বাসায় ইত্তেফাক, দৈনিক পাকিস্তান, দৈনিক আজাদ, মর্নিং নিউজ ইত্যাদি পত্রিকা দেখতাম। সেগুলোতে বিভিন্ন লেখক, কবি সাহিত্যিক বা রাষ্ট্রপ্রধানদের ছবি ছাপা হতো। আমি এ সব দেখতাম। কীভাবে এসব ছবি তোলা হয়েছে, ক্যামেরার ফোকাসই বা কীভাবে করেছেন এসব ভাবতাম। কাগজের ঠোঙায়ও অনেকের ছবি দেখতাম। এসব আমাকে দারুণ আলোড়িত করত। বিখ্যাত মানুষদের ছবি তোলার সময় কী করতে হয় সেগুলো আমাকে ভাবাত। এক সময় দেখলাম আমি সেলিব্রেটিদের ভক্ত হয়ে গেছি। পত্রিকা থেকে ওদের ছবি কাটতাম। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পর ভাবলাম কিছু একটা করব। তারপর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে প্রথম পোট্রেট ফটোগ্রাফির সূচনা করি। 

বঙ্গবন্ধু যখন দেশে ফিরলেন তখন অনেক সংবর্ধনা দেওয়া হলো। সেসময় এত বেশি নিরাপত্তার ব্যাপার ছিল না। যে কেউ চাইলেই একটা ক্যামেরা হাতে ঢুকে পড়তে পারত তাঁর সভায়। একবার রেসকোর্স ময়দানে গেলাম তাঁর ছবি তুলতে। অসংখ্য লোক। এক পর্যায়ে স্টেজে যেতে পারলাম। কিন্তু কোনোভাবেই হাত সোজা করে ছবি তোলা যাচ্ছিল না, এত মানুষ। বিবিসির হিসেবে সাত লাখ লোক। হাত উপরে তুলে ছবি ক্লিক করছিলাম। বঙ্গবন্ধুর ছবি তুললাম। এক দেড় মিনিটের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর দেহরক্ষী প্রধান ছিলেন মহিউদ্দিন সাহেব এসে কাঁধে হাত রাখলেন খুব ভদ্রভাবে। জিজ্ঞাস করলেন, কোন পত্রিকা? না সূচক মাথা নাড়লাম। আইডি কার্ড আছে? মাথা নেড়ে না বললাম। তিনি আমাকে স্টেজ থেকে নামিয়ে দিলেন। আমার মন খুব খারাপ হলো। যা হোক, বঙ্গবন্ধুর সেই ছবিটি এখনও আছে। এখনও ছাপা হয়। 

সিলেট মিরর: শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদের সঙ্গে তো বেশ ভালো সম্পর্ক ছিল আপনার? অন্যদিকে তাদের দুজনের বৈরিতাও সর্বজনবিদিত। আপনি একসঙ্গে তাদের সাক্ষাৎকার নিলেন। এ ব্যাপারে কিছু বলবেন?

নাসির আলী মামুন: শামসুর রাহমান এবং আল মাহমুদের উপর আমার একটা বই আছে। নাম ‘তফাৎ ও সাক্ষাৎ’। এই দুই কবিকে এক জায়গায় আনার চেষ্টা করেছি। তারা রাজী হচ্ছিলেন না। পরে একদিন আল মাহমুদকে নিয়ে শামসুর রহমানের বাসায়ই চলে গেলাম। শামসুর রাহমান অবাক হয়েছিলেন। কিন্তু কেউ কারো সঙ্গে কথা বললেন না। অবশ্য আমি দুজনেরই একসঙ্গে ছবি তুলেছি। এপিঠ-ওপিঠ বসে আছেন। 

সিলেট মিরর : গুন্টার গ্রাসের ছবি তোলা নিয়ে কিছু বলেন। 

নাসির আলী মামুন: গুন্টার গ্রাস ১৯৮৬ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় এসেছিলেন কাউকে না জানিয়ে। সেসময় জার্মান কালচারাল সেন্টারের পরিচালক পিটার জেভিৎস আমাকে খবর দেন। আর বেলাল চৌধুরীও আমাদের সঙ্গে ছিলেন। প্রথম কয়েকদিন দূর থেকে দেখেছি গুন্টার গ্রাস আর তার স্ত্রী উটে গ্রাসকে। পরে আস্তে আস্তে তাদের কাছে চলে যাই আমি আর আমার ক্যামেরা। ঢাকা শহর ঘুরে ঘুরে তাঁকে দেখানো হয়। লালবাগে রিকশায় চড়ে যাই। সামনের রিকশায় আমি। পেছনের রিকশায় গুন্টার গ্রাস ও তার স্ত্রী। আমি ক্লিক করেই চলেছি। এ এক অন্যরকম অভিঞ্জতা। পরবর্তী সময়ে ঢাকা সফর নিয়ে নিয়ে ‘গুন্টার গ্রাস: ডিসকভারস ঢাকা’ নামে একটা সচিত্র বই লিখি। এটা বাংলা ও ইংরেজিতে বেরিয়েছিল আগামী প্রকাশনী থেকে। 


সিলেট মিরর : শান্তিতে নোবেল পুরস্কার জয়ী মাদার তেরেসার ছবিও তো আপনি তুলেছিলেন?

নাসির আলী মামুন: শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়া মাদার তেরেসা বাংলাদেশ আসলেন। তিনি প্রথমে উঠলেন তেজগাওয়ে একটা চার্চে। তার জন্য একটা মাইক্রোবাস রেডি ছিল-আমি আগেই খবর পেয়েছিলাম। ওখান থেকে তিনি পুরান ঢাকায় যাবেন মিশনারী অব চ্যারেটিতে। এটি তার একটা প্রতিষ্ঠান। আমি ঢুকতে চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু চার্চের লোকজন ঢুকতে দিচ্ছিল না। কিছুক্ষণ পর সেখানে এলেন ইত্তেফাকের নাজিম উদ্দিন মোস্তাকভাই এলেন। তিনি সিনিয়র রিপোর্টার। তিনি আমাকে বললেন-আপনি থাকেন, দেখি কে আমাদের আটকায়। উনাকে আমি বললাম আপনি গেইটে থাকেন আমি গাড়ির কাছে থাকি। প্রায় চল্লিশ মিনিট পরে দ্রুত মাদার তেরেসা হেঁটে আসতে লাগলেন। সঙ্গে তিনজন নার্স। এত দ্রুত হাটছিলেন মনে হলো তাঁর বয়স ত্রিশ বছর। জোরে জোরে আসলেন-আমার দিকে তীব্র রাগ নিয়ে তাঁকিয়ে। আমি গাড়ির দরজার সামনে দুই হাত মেলে দাঁড়ালাম। বললাম, মাদার আমি ছবি তুলতে চাই। আমি এক ঘন্টা যাবত এখানে দাঁড়ানো। তারা ঢুকতে দিচ্ছে না। তখন নাজিম উদ্দিন ভাই বলতে শুরু করলেন, আপনাকে নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে। আপনি যদি সাক্ষাৎকার না আমি কিন্তু আপনার বিরুদ্ধে রিপোর্ট করব। মাদার তেরেসা খুব রাগান্বিত-উল্টে হাঁটা শুরু করলেন। ভেতরে তাঁর পেছনে ঢুকে বুঝলাম এটা একটি শ্রেণিকক্ষ। সেখানে আমাদের বসানো হলো। তখনও তিনি রাগে ফুঁসছিলেন। তিনি বললেন-এই যে তুমি আমাকে আটকালা, জানো কতজন শিশু আমার জন্য বসে আছে, অপেক্ষা করছে। কেন করলা, এর জন্য তুমি কী অনুতপ্ত না? ক্ষমা চাও না? আমি ক্ষমা চাওয়ার মতো করে হাত জোড় করলাম। উনি যেহেতু এসে বসল তার মানে উনি ছবি তুলতে দিতে রাজি। নাজিম উদ্দিন ভাই প্রশ্ন করা শুরু করলেন। আমি ছবি তুলতে লাগলাম একটার পর একটা। 

সিলেট মিরর: স্টিফেন হকিংয়ের ছবি তোলা প্রসঙ্গে যদি কিছু বলতেন?

নাসির আলী মামুন: স্টিফেন হকিংয়ের ছবি তোলাও অনেকটা নাটকীয়। ২০০৯ সালের ১২ আগস্ট নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহম্মদ ইউনুসের সঙ্গে আমি গিয়েছিলাম হোয়াইট হাউসে। হোয়াইট হাউসের ‘প্রেসিডেন্টশিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম’ দেবেন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। সেবার ১৬ জনকে দিয়েছিল। ড. মুহম্মদ ইউনুসের সহায়তায় সেই অনুষ্ঠান কাভার করতে যাওয়া। অনেক কাঠখড় পুড়াতে হলো সেখানে ঢুকার অনুমতি পেতে। 

যা হোক, সেখানে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের পেলাম। অই অনুষ্ঠানে স্টিফেন হকিংসের কিছু ছবি তুললাম। তার অসুস্থতার ছবি। এটা তাঁর মেয়ে ফলো করছিল। অনুষ্ঠান শেষে আরেক জায়গায় যখন দেখা হলো তখন আমি অন্যদের ছবি তুলছিলাম। তখন স্টিফেন হকিংয়ের মেয়ে লুসি হকিং আমাকে এসে খুব আদরের সঙ্গে বলল, ‘তুমি যে ওই ছবিগুলো তুললে, লালা পড়ছিল, এগুলো কিন্তু আমরা কাউকে তুলতে দেই না। তুমি যে তুলেছ এটা আমি দেখেছি। তুমি কি সেগুলো ফেলে দেবে। প্লিজ। আমি তখন বললাম, ঠিক আছে ফেলে দিচ্ছি। একটু দূরে গিয়ে ফেলে দেওয়ার ভঙ্গি করলাম। পরে এসে বললাম, তোমার বাবার ছবি তুলতে চাই। তুলতে দেবে? তিনি তখন বললেন, হ্যাঁ তোলো। আমার সঙ্গেও তুলে একটা তুলে দাও। 

সিলেট মিরর: সিলেট কেমন লাগে?

নাসির আলী মামুন: সিলেট... কি বলব। সিলেট মানুষকে সংক্রমিত করে দেয়, যে-ই এখানে আসে তাকে। যেমন আমাকেও করেছে। প্রথম যেইবার আসলাম। 

সিলেট মিরর: সিলেট প্রথম কবে এসেছিলেন?

নাসির আলী মামুন: প্রথম ১৯৭৭ সালে। পরের বছর ১৯৭৮ সালে পরপর দুইবার। আবার ১৯৮১ সালে। এরপর দীর্ঘদিন আসিনি। শেষ এসেছিলাম ২০০২ সালে আসলাম। তখন কবি দিলওয়ারের বাসায় উঠেছিলাম। উনার দীর্ঘ একটা সাক্ষাৎকার নিলাম। তখন কাকতালীয়ভাবে বাউল সম্রাট শাহ্ আব্দুল করিমেরও ছবি তোলা হয়েছিল। 

সিলেট মিরর: সিলেটের কোন বিষয়টি আলাদাভাবে দাগ কাটে?

নাসির আলী মামুন: এই সিলেট, এমন একটা জেলা, এই জেলার সঙ্গে, জেলার সাহিত্য, জেলার দর্শন হলো মৌলিক দর্শন, এবং যে মরমীয়া-এটা মৌলিক এবং এটা বাংলাদেশের, পূর্ববঙ্গে আর কোথাও এটার সঙ্গে মিলে না। সিলেটের যে দর্শন, বাংলার মৌলিক চিন্তা এবং দর্শন, এই মৌলিক চিন্তা ও দর্শনে সিলেটের যে সংস্কৃতি, এই সংস্কৃতির সূর্যের অস্ত কোনোদিন যায় না। 

সিলেট মিরর: নবীন আলোকচিত্রদের উদ্দেশ্যে কি পরমার্শ?

নাসির আলী মামুন: আমি বলব আপনারা কারো পরামর্শ শুনবেন না। নাসির আলী মামুনের তো না-ই। আপনার সঙ্গে যে মোবাইল, যে ইন্টারনেট ওটাই বড় বিশ্ববিদ্যালয়। আপনি শুধু ফটোগ্রাফিই না, আপনি দৃশ্যশিল্পের যে বিষয় নিয়ে জানতে চান, প্রশ্ন করতে চান, সে একাধিক উত্তর দেবে আপনাকে যে কোনো ভাষায়। আপনি পৃথিবীর যে কোনো মিউজিয়ামে ভ্রমণ করতে পারবেন। বড় বড় ফটোগ্রাফারদের ছবি আপনি ঘেটে বের করতে পারবেন, দেখতে পারবেন। কাজেই কারো পরামর্শ আপনার দরকার নাই। শুধু আপনি কি চাইলেন, কোন লাইনে আপনি যেতে চান ঠিক করেন।


এএফ/০৩